অকর্ণ১
বিশেষ্য
বিশেষণ
ব্যুৎপত্তি
সংস্কৃত ন = অ (নাই) কর্ণ (কান) যার–বহুব্রীহি সমাস।
প্রয়োগ
- ১.অচক্ষু সর্ব্বত্র চান, অকর্ণ শুনিতে পান, অপদ সর্ব্বত্র গতাগতি। – অন্নদামঙ্গল, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর
টীকা
অচক্ষু সর্ব্বত্র চান, অকর্ণ শুনিতে পান, অপদ সর্ব্বত্র গতাগতি।– ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর এই বাক্যে অচক্ষু (চোখহীন), অকর্ণ (কানহীন), অপদ (পাহীন) বলতে পরমাত্মা, পরম ব্রহ্মকে বুঝিয়েছেন। হিন্দু মতে ব্রহ্মের কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নেই, কিন্তু ইসলামী মতে আল্লাহর মুখমণ্ডল, হস্ত, পদ, চক্ষু আছে–কিন্তু সেগুলো মানবের ব্যাখ্যাতীত।
অকর্ণ২
বিশেষ্য
ব্যুৎপত্তি
সংস্কৃত অ (অভাবার্থে) + কর্ণ (সূতপুত্র রাধেয়) = অঙ্গরাজ মহাবীর কর্ণ।
মহাবীর কর্ণ
[পৌরাণিক]
মহাভারতের অন্যতম স্মরণীয় চরিত্র অঙ্গরাজ কর্ণ। অসামান্য বীরত্ব, দানশীলতা, বন্ধুত্বের প্রতি নিষ্ঠা এবং জীবনের গভীর করুণ পরিণতির জন্য তিনি ভারতীয় মহাকাব্য-পরম্পরায় এক স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করে আছেন। কুন্তীর জ্যেষ্ঠ পুত্র হয়েও সামাজিক পরিচয়ের কারণে তাঁকে সারাজীবন পরিচয়সংকট ও অবমাননার মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম, দুর্যোধনের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অবিচলতা তাঁকে মহাভারতের সবচেয়ে জটিল ও মানবিক চরিত্রগুলির একটিতে পরিণত করেছে।
কর্ণের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বিস্ময়কর কাহিনি। কুন্তী ঋষি দুর্বাসার কাছ থেকে এমন এক মন্ত্র লাভ করেছিলেন, যার সাহায্যে তিনি যে কোন দেবতাকে আহ্বান করতে পারতেন। কৌতূহলবশত সেই মন্ত্রের প্রয়োগ করে তিনি সূর্যদেবকে আহ্বান করেন। সূর্য সহবাসে তাঁর গর্ভে কর্ণের জন্ম হয়। জন্ম থেকেই তাঁর দেহে ছিল সহজাত কবচ ও কুণ্ডল, যা তাঁকে বিশেষ সুরক্ষা দিত। অবিবাহিত অবস্থায় সন্তান জন্মানোর সামাজিক লজ্জার ভয়ে কুন্তী নবজাতককে একটি পেটিকায় রেখে নদীতে ভাসিয়ে দেন। অধিরথ নামে এক সারথি এবং তাঁর স্ত্রী রাধা শিশুটিকে খুঁজে পেয়ে লালন-পালন করেন। তাঁদের কাছেই কর্ণ বড় হয়ে ওঠেন। পালক-মাতার নাম অনুসারে তিনি রাধেয় নামেও পরিচিত হন।
কর্ণ শৈশব থেকেই অস্ত্রশিক্ষা ও যুদ্ধে পারদর্শী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন। কিন্তু সারথির পুত্র হিসেবে পরিচিত হওয়ায় তাঁকে বারবার সামাজিক বৈষম্যের শিকার হতে হয়। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, তিনি পরশুরামের কাছে ব্রাহ্মণের ছদ্মপরিচয়ে অস্ত্রশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। পরে পরিচয় প্রকাশিত হলে পরশুরাম তাঁকে অভিশাপ দেন যে, জীবনের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে তিনি শেখা বিদ্যার প্রয়োজনীয় মন্ত্র ভুলে যাবেন। আরেকটি অভিশাপের কাহিনিতে বলা হয়, অসাবধানতাবশত এক ব্রাহ্মণের গাভী নিহত হওয়ায় কর্ণকে অভিশাপ দেওয়া হয় যে, যুদ্ধের সংকটকালে তাঁর রথের চাকা মাটিতে বসে যাবে। এই অভিশাপগুলি পরবর্তী কুরুক্ষেত্রযুদ্ধে তাঁর পরিণতির সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত হয়ে আছে।
হস্তিনাপুরে কৌরব ও পাণ্ডব রাজপুত্রদের অস্ত্রবিদ্যার প্রদর্শনীতে কর্ণ অর্জুনের সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন। কিন্তু তাঁর বংশপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তিনি অর্জুনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার উপক্রম হন। সেই সময় দুর্যোধন তাঁকে অঙ্গদেশের রাজা ঘোষণা করেন। এই ঘটনার পর থেকেই কর্ণ অঙ্গরাজ নামে পরিচিত হন। দুর্যোধনের এই সম্মানকে কর্ণ সারাজীবন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য বজায় রাখেন। তাঁদের বন্ধুত্ব মহাভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক; তবে এই আনুগত্যই কর্ণকে এমন এক পক্ষের হয়ে যুদ্ধ করতে বাধ্য করে, যার নৈতিক অবস্থান নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
কর্ণের দানশীলতা তাঁকে মহাভারতের লোকপ্রিয় কিংবদন্তিতে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। তিনি দানবীর কর্ণ নামে পরিচিত। কথিত আছে, প্রার্থনাকারীকে তিনি কখনও খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন না। কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের আগে ইন্দ্র ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে তাঁর কাছে এসে সহজাত কবচ ও কুণ্ডল প্রার্থনা করেন। কর্ণ বুঝতে পেরেছিলেন, এগুলি দান করলে তাঁর প্রাণরক্ষার স্বাভাবিক সুবিধা নষ্ট হবে; তবু তিনি নিজের দানপ্রতিজ্ঞা রক্ষার্থে সেগুলি দিয়ে দেন। বিনিময়ে ইন্দ্র তাঁকে একবার ব্যবহারযোগ্য শক্তিশালী অস্ত্র প্রদান করেন। এই কাহিনিতে কর্ণের উদারতা যেমন প্রকাশিত, তেমনি তাঁর আত্মত্যাগের সঙ্গে যুক্ত করুণ পরিণতির পূর্বাভাসও মেলে।
কর্ণের জীবনের সবচেয়ে জটিল দিকগুলির একটি তাঁর জন্মপরিচয়। কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের আগে কুন্তী তাঁর কাছে গিয়ে প্রকাশ করেন যে, কর্ণ আসলে তাঁরই জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং পাণ্ডবদের বড় ভাই। কুন্তী তাঁকে পাণ্ডবপক্ষে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু কর্ণ দুর্যোধনের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও বন্ধুত্বের বন্ধন ছিন্ন করতে অস্বীকার করেন। তিনি কুন্তীকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, অর্জুন ছাড়া অন্য কোন পাণ্ডবকে তিনি হত্যা করবেন না; ফলে কুন্তীর পাঁচ পুত্রই শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকবে—হয় অর্জুন, নয় কর্ণ। এই সিদ্ধান্ত তাঁর আনুগত্যের গভীরতা প্রকাশ করে, আবার তাঁর জীবনের অনিবার্য বিয়োগান্ত পরিণতিকেও তীব্র করে তোলে।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কর্ণ কৌরবপক্ষে প্রধান যোদ্ধা হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। ভীষ্ম সেনাপতিত্বে থাকাকালে তাঁদের পারস্পরিক বিরোধের কারণে কর্ণ প্রথমদিকে যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেননি বলে মহাভারতে বর্ণিত হয়েছে। পরে দ্রোণের মৃত্যুর পর তিনি কৌরবসেনার সেনাপতি হন। তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল অর্জুনকে পরাজিত করা। দুই মহাবীরের সংঘর্ষ মহাভারতের যুদ্ধবর্ণনার অন্যতম চূড়ান্ত মুহূর্ত। কিন্তু যুদ্ধের সংকটকালে কর্ণের রথের চাকা মাটিতে বসে যায় এবং তিনি তা উদ্ধারের চেষ্টা করেন। সেই সময় কৃষ্ণ অর্জুনকে কর্ণের পূর্ববর্তী অন্যায়গুলির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। অর্জুনের অস্ত্রাঘাতে কর্ণ নিহত হন। তাঁর মৃত্যু মহাভারতের সবচেয়ে করুণ ও বিতর্কিত ঘটনাগুলির একটি।
কর্ণকে নিছক মহাবীর বা নিছক ত্রুটিপূর্ণ মানুষ—কোন একটিমাত্র পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবান, দানশীল ও বন্ধুত্বে অবিচল; একই সঙ্গে দুর্যোধনের প্রতি আনুগত্যের কারণে অন্যায়ের পক্ষেও দাঁড়িয়েছিলেন। দ্রৌপদীর অপমানের ঘটনায় তাঁর ভূমিকা এবং অভিমন্যুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণ তাঁর চরিত্রের নৈতিক জটিলতাকে স্পষ্ট করে। সামাজিক অবমাননা তাঁর মধ্যে যে ক্ষোভ ও আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করেছিল, তা তাঁর অনেক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল; তবে সেই অভিজ্ঞতা তাঁর সব কাজকে ন্যায়সংগত করে না।
অঙ্গরাজ কর্ণের জীবন তাই জন্মপরিচয়, সামাজিক বৈষম্য, কৃতজ্ঞতা, বন্ধুত্ব, আত্মসম্মান, দানশীলতা ও নৈতিক দায়বদ্ধতার এক জটিল আখ্যান। নিজের প্রকৃত পরিচয় অজানা রেখে তিনি যে জীবন কাটিয়েছেন, তা তাঁকে একদিকে মহাবীরের মর্যাদা দিয়েছে, অন্যদিকে গভীর বেদনায় আচ্ছন্ন করেছে। মহাভারতের অন্যান্য চরিত্রের মতো কর্ণও আলো ও অন্ধকারের সমন্বয়ে গঠিত। তাঁর জীবনের মহত্ত্ব যেমন স্মরণীয়, তেমনি তাঁর ভুল সিদ্ধান্তগুলিও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ব্যক্তিগত আনুগত্য ও প্রতিজ্ঞা মহৎ গুণ হলেও ন্যায়-অন্যায়ের বিচার থেকে মানুষকে মুক্তি দেয় না।
অকর্ণ৩
বিশেষ্য
ব্যুৎপত্তি
সংস্কৃত ন = অ (নাই) কর্ণ (হাল) যার–বহুব্রীহি সমাস।