মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ: এক বিস্মৃত বংশলতিকা ও বিচ্ছেদের ইতিহাস

ইতিহাস কথা বলে। কখনও নিভৃতে, কখনও বা জনসমক্ষে উন্মোচিত হয় এক একটি নাটকীয় অধ্যায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্থপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর পারিবারিক ইতিহাস সেই রকমই এক বৈচিত্র্যময় আখ্যান।

ভারতের গুজরাট রাজ্যের সমুদ্রোপকূলবর্তী গ্রাম পানেলি মতি। সেখানে মেঘজি ঠাকুর নামে এক ব্রাহ্মণ বাস করতেন। জীবিকার তাগিদে তিনি মৎস্য ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলেন। ব্যবসা বেশ রমরমা থাকলেও স্থানীয় রক্ষণশীল সমাজপতি ও পুরোহিতেরা এতে বাঁধ সাধলেন। একজন ব্রাহ্মণ হয়ে আমিষ ভক্ষণ ও মৎস্য ব্যবসায়ের ‘পাপ’ করার অজুহাতে মেঘজি ও তাঁর পরিবারকে সমাজচ্যুত করা হলো।

একঘরে হয়ে যাওয়ার গ্লানি থেকে বাঁচতে মেঘজি ব্যবসা ত্যাগ করে পুনরায় স্ববর্ণে ফেরার আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন, কিন্তু সমাজপতিরা তাকে গ্রহণ করেননি। পিতার এই অবমাননা মেঘজি ঠাকুরের পুত্র পুঞ্জলাল ঠাকুরকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত করে। ক্ষোভের আগুনে দগ্ধ হয়ে তিনি চার পুত্রসহ হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে বাহাই ধর্ম গ্রহণ করেন এবং বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই) স্থায়ীভাবে চলে আসেন, এবং বাহাই রীতিতে নামের শেষে বাহাই ব্যবহার করতেন। অনেকে এই বাহাইকে ভাই উচ্চারণ করেন। এই পুঞ্জলাল ঠাকুরের মেজো পুত্রই হলেন আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

এই আখ্যান কেবল জিন্নাহর নয়, বরং তাঁর একমাত্র কন্যা দিনা জিন্নাহর। জিন্নাহ নিজেও সমাজ ও ধর্মের প্রথা ভেঙে বিয়ে করেছিলেন এক পার্সি রমণী রতন বাহাইকে, ততদিনে জিন্নাহ তার পদবী বাহাই ত্যাগ করে জিন্নাহ ব্যবহার শুরু করেছিলেন এবং বাহাই ধর্ম ত্যাগ করে ইসমাইলী শিয়া ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। যদিও বাস্তব জীবনে তিনি ধর্মের ধার ধারতেন না।

১৯১৯ সালের ১৫ই আগস্ট তাঁদের কোল আলো করে জন্ম নেন দিনা। অদ্ভুত সমাপতন যে, দিনার জন্মের ঠিক আটাশ বছর পর এই একই দিনে ভারত স্বাধীন হয়েছিল।

১৯৩৮ সালে ১৯ বছর বয়সী দিনা এক পার্সি (জরাথ্রষ্টু) যুবকের প্রেমে পড়েন। জিন্নাহ নিজে শিয়াত্ব গ্রহণ করলেও তার স্ত্রী বাহাই ধর্মেই বহাল ছিলেন। ইসমাইলি শিয়ারা মুসলিম হিসাবেই পরিচিত,— কিন্তু ততদিনে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার সুবাদে তিনি তাঁর একমাত্র কন্যা অমুসলিমকে বিয়ে করবেন— এ কথা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। ক্ষমতার মধ্যগগনে থাকা জিন্নাহর প্রবল অমত থাকা সত্ত্বেও দিনা তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। তিনি পার্সি বংশোদ্ভূত ভারতীয় নাগরিক নেভিল ওয়াদিয়াকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেন। ১৯৪৩ সালে স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ হওয়ার পর তিনি তাঁর একমাত্র পুত্রকে নিয়ে বোম্বেতে তাঁর পিতামহের নির্মিত পৈত্রিক নিবাসে জীবন অতিবাহিত করতে শুরু করেন।

১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট দেশ ভাগ হলো। লাখো মানুষ দেশ ছাড়ল, এক ভূখণ্ড থেকে অন্য ভূখণ্ডে পাড়ি জমালো। জিন্নাহ তখন পাকিস্তানের প্রতাপশালী গভর্নর জেনারেল। তিনি কন্যাকে করাচি চলে আসার আমন্ত্রণ জানালেন। তখন দিনা তাঁর পিতাকে এক তীক্ষ্ণ ও সংবেদনশীল প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন— “আমার মায়ের কী হবে? তুমি কি মায়ের কবর বোম্বে থেকে পাকিস্তানে নিয়ে যেতে পারবে?”

দিনা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর শেকড় ভারতেই। তিনি আমৃত্যু গর্বের সাথে বলতেন, “বোম্বে ইজ মাই সিটি।” পিতার শেষকৃত্যে যোগ দিতে ১৯৪৮ সালে তিনি একবার পাকিস্তানে গিয়েছিলেন সত্য, কিন্তু এরপর আর কখনও সেই ভূমিতে পদার্পণ করেননি।

বাবার উত্তরাধিকার নয়, বরং নিজ দক্ষতায় তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যে মন দেন। আজ ভারতের অন্যতম শীর্ষ ধনী নাসলি ওয়াদিয়া হলেন দিনা জিন্নাহর পুত্র এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নাতি। নাসলি ওয়াদিয়ার দুই সন্তান— জাহাঙ্গীর ও নেস ওয়াদিয়া বর্তমানে ভারতের অন্যতম বড় শিল্পপতি। নেস ওয়াদিয়া আইপিএলের দল ‘কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবে’র অন্যতম মালিক।

ইতিহাসের এক নির্মম ও অদ্ভুত পরিহাস হলো এই যে, যে মানুষটি “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” স্লোগান দিয়ে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁর রক্তের সব উত্তরাধিকারই আজ গর্বিত ভারতীয় নাগরিক। পাকিস্তানে তাঁর কোনও উত্তরসূরি আজ আর নেই।