আলয়ইন্দ্র

ইন্দ্র

ইন্দ্র/ বি. ১ দেবতাদের রাজা, পুরন্দর; বাসব; ২ প্রধান বা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি (যোগীন্দ্র, বীরেন্দ্র); ৩ রাজা, অধিপতি (নরেন্দ্র, দনুজেন্দ্র)। [সং. √ ইন্দ্ + র]। ইন্দ্র [ইন্‌দ্ (আধিপত্য করা) + র (কর্তৃবাচ্য- সংজ্ঞার্থে)—যিনি দেবগণের উপর আধিপত্য করেন] বিশেষ্য, দেবরাজ; সুরপতি। পুরুষসূত্তমতে ইন্দ্র অগ্নির সাথে পুরুষের মুখ হতে নির্গত হয়েছিলেন। তৈত্তিরীয়তে তিনি অদিতির গর্ভসম্ভূত। স্বর্গের অধিপতি বলেয়া তাঁর নাম ‘স্বর্গাধিপ’, ‘স্বরাট্’, ‘দিবস্পতি’। বেদে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা বলে উক্ত, তাই তাঁর নামান্তর লেখর্ষভ। বৈদিক ভারতে ইন্দ্র আদিদেবতা কিন্তু পুরাণে তিনি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর—এই তিন শক্তির অধীন; তবুও স্তুতির সময় ‘ঈশ্বর’ বলে উক্ত;— ‘নমোহস্তু তস্মৈ জগদীশ্বরায় লোকত্রয়েশায় পুরন্দ রায়।’ একশত অশ্বমেধ যজ্ঞ করলে ইন্দ্রত্বলাভ হয়। তাই ইন্দ্রের নাম-শতমখ, শতক্রতু, শতমন্যু। দেবমানে শতবর্ষ রাজ্য করলে ইন্দ্রত্ব যায়; তখন দেব, দানব, মানব যে কেহ স্বীয় তপঃপ্রভাবে শত অশ্বমেধ যজ্ঞ সমাপন করে ঐ পদ লাভ করেন এবং পুরী—অমরাবতী, প্রসাদ— ‘বৈজয়স্ত’, উদ্যান— ‘নন্দন’, হস্তী— ‘ঐরাবত’, এবং অশ্ব—’উচ্চেঃশ্রবা’ ইত্যাদি ইন্দ্রের এশ্বর্য্য ভোগ করেন। পাছে কেউ তপঃপ্রভাবে ইন্দ্রত্বলাভ করে, এই ভয়ে ইন্দ্র উগ্র তাপসগণের সাধনায় বিবিধ বিঘ্ন উৎপাদন করতেন। স্বর্গপুরী ও স্বর্গের সুখ ও ধনৈশ্বর্যের অধিপতি বলে ইন্দ্রের অন্য নাম ‘বাসব’ ও ‘বাস্তোস্পতি’। ইন্দ্রপত্নীর নাম ‘শচী’; তাঁর পুত্র ‘জয়ন্ত’ (কিন্তু বহু পুরাণে ইন্দ্রাদি দেবগণ অপুত্রক)। জয়ন্ত ব্যতীত ইন্দ্রপুত্র—(২) বালী। (৩) অর্জুন [রামায়ণ, মহাভারত] এবং (৪) মালাধর ও (৫) নীলাম্বর [চণ্ডীকাব্য, ধর্ম্মমঙ্গল, কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্ত্তী] সুরপতি ইন্দ্র দেবদ্বেষী অসুর দিগের চিরশত্রু। অসুরগণ ঘোর অত্যাচারী হলে এবং বাহুবলে স্বর্গ অধিকার করলে ইন্দ্র ঘোরতর সংগ্রাম করে অসুর বিনাশ করতেন। এইরূপে অসুরদিগের প্রধান বৃত্র, নমুচি, বল, জম্ভ, অহি, চুমুরি, ধূনি, পিপন, শুষ্ণ ইত্যাদি তাঁর হস্তে নিধন প্রাপ্ত হলে ইন্দ্র ‘বৃত্রহা’, ‘বৃত্রঘ্ন’, ‘নমুচিসূদন’, ‘জম্ভভেদী’, ‘জম্ভভেদন’, ‘বলরিপু’, ‘বলভিদ্’, ‘বলভেদন’, ‘বলারাতি’, ‘পুরুহূত’, ‘পাকশাসন’ ইত্যাদি নামে আখ্যাত। তিনি অসুরপুরী বিদারণ করায় তাঁর নাম ‘পুরন্দর’। দধীচিমুনির অস্তিতে বিশ্বকর্মাকর্তৃক নির্মিত বজ্রদ্বারা অসুর নিপাত ও পর্বত বিদারণ করেন এবং তাঁর প্রধান অস্ত্রস্বরূপ বজ্রকে ধারণ করেন বলে নাম—গোত্রভিদ্, বজ্রী, আখণ্ডল। তাঁর অশ্বগণ হরিদ্বর্ণ বলে নাম হরিহয়, হরিদশ্ব। মেঘ বাহন বলিয়া নাম ‘মেঘ-বাহন’। ইন্দ্র বারি বর্ষণ করেন বলে নাম ‘বৃষা’। গৌতমপত্নী অহল্যাকে হরণ করায় মুনিশাপে সর্বাঙ্গে সহস্রযোনি প্রকাশ পায়; পরে বিহিত যজ্ঞানুষ্ঠান করলে যোনি লোচনে পরিণত হয়। তদবধি তিনি সহস্রাক্ষ; সহস্রলোচন ইত্যাদি নামে প্রসিদ্ধ [তুলনামূলক বেদ ও পূরাণের বৃত্রঘ্ন ইন্দ্র—পারসিক জেন্‌দ্‌আবেস্তায় বেরেথ্রগ্ন (Verethragna) এন্দ্র এবং গ্রীক—Orthropon. (গ্রীক—orthros অথ্রঃ, তুলনামূলক পারসীক verethra = বৃত্র-pon পণ (হন্) ইন্দ্রের ন্যায় গ্রীক zeus (জি̣য়স্)। তুলনামূলক ল্যাতিন jovis-jupiter)-দিবস্পতি, দেবরাজ, সুরশ্রেষ্ঠ, দৈত্যরিপু, বজ্রধারী; মেঘবাহনের ন্যায় মেঘাবৃত মস্তক; বৃধার ন্যায় বৃষ্টিপদ; মেঘসমূহের পরিচালক ও পৃথিবীর উৎপাদিকা শক্তিপ্রদাতা এবং বজ্রীর ন্যায় হিফেটস্ নির্মিত অশনি-নামক অমোযাস্ত্র প্রহারে টাইটান নামক দৈত্যকুল নির্মুলকারী ও দেবগণের সুখশান্তি বিধাতা। অদিতিনন্দন ইন্দ্রের সহিত গ্রীক সূর্যদেব Hellenic Apolloর কথঞ্চিৎ সাদৃশ্য আছে—উভয়েরই বাণাধার সুবর্ণময়, উভয়েই অগ্নিময় রথে আরোহণ করে স্বর্গ পরিভ্রমণ করেন। ইন্দ্রের অশ্বগণ হরিৎ হেলিয়সের অশ্বগণের নাম চরিত—Charities—ভারতকোষ দ্রষ্টব্য]। ইন্দ্র বিশেষ্য, প্রধান; শ্রেষ্ঠ [এই অর্থে শব্দের পর যুক্ত হয়। যথা—দেবেন্দ্র, নরেন্দ্র, মনুজেন্দ্র, বীরেন্দ্র ইত্যাদি] ২ রাজা; অধিপতি [এই অর্থে শব্দের পর যুক্ত হয় যথা—ধরেন্দ্র] ৩ [বেদান্ত] পরমেশ্বর। ৪ সূর্য। ৫ যোগ বিশেষ। ৬ তিক্তবীজবিশেষ। ৭ কুটজবৃক্ষ। ৮ উপদ্বীপবিশেষ। ৯ রাত্রি। ১০ বিশেষণ, ঐশ্বর্যশালী। বিশেষণ, ঐন্দ্র। স্ত্রীং ইন্দা, ইন্দ্রাণী (দ্রষ্টব্য)।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ

শব্দসূত্র