দশচক্রে ভগবান ভূত

দশচক্রে ভগবান ভূত

প্রবাদ

  • – দশ জনের অর্থাৎ অনেক মানুষের চক্রান্তে অসম্ভবও সম্ভব হয়, এইরকম চক্রান্তের ফলেই ভগবান নামে ব্যক্তি ভূত বলে পরিগণিত হয়েছিল।
  • – জনতার পাকেচক্রে পড়ে অদৃশ্য পরমাত্মার দৃশ্যমান বস্তুতে পরিনত হওয়া—এভাবেই অদৃশ্য ঈশ্বরের দৃশ্যমান মূর্তিপূজার প্রচলন হয়েছিল৷

প্রচলিত গল্প

ভগবানের ভূতে পরিণত হওয়ার নিয়ে দুটি কাহিনী প্রচলিত আছে৷ প্রথম কাহিনীটি হলো—

ভগবান নামক এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ একরাজার প্রিয়পাত্র হয়েছিলেন, রাজা তাকে খুব ভালোবাসতেন এবং তার পরামর্শে রাজকার্য পরিচালনা করতেন৷ এই জন্য অন্য অমাত্যরা তাকে হিংসা করতো৷ একদিন রাজবৈদ্য ও অমাত্যরা মিলে ষড়যন্ত্র করলেন যে, রাজার কাছ থেকে ভগবান ঠাকুরকে সরাতে হবে৷ তারা প্রাসাদের রক্ষীকে রাজার নাম করে নির্দেশ দিলো যাতে ভগবান ঠাকুর রাজপ্রাসাদে আর প্রবেশ করতে না পারে৷

বেশ কিছুদিন রাজসভায় ভগবান ঠাকুরকে অনুপস্থিত দেখে রাজা জানতে চাইলেন, ভগবান কোথায়?

সকলে জানালো, ভগবান তেরো দিন পূর্বে মারা গিয়েছে৷

রাজা শুনে অতি ক্ষুদ্ধ ও বিস্মিত হয়ে বললেন, কই না তো, তাঁর পুত্রও তো আমার নিকট আসে নি?

চক্রকারী অমাত্যরা বললো, ওরা ঐরকম, আপনাকে গ্রাহ্য করে না।

কিছুদিন পরে ভগবান রাজার সাথে সাক্ষাতের উপায়ান্তর না পেয়ে স্থির করলেন যে, রাজা যেদিন অপরাহ্নে নদীতীরে পদব্রজে ভ্রমন করতে আসবেন সেইদিন নদীতীরস্থ কোন উঁচু ব়ৃক্ষে আরোহণ করে রাজাকে দর্শন করবো। পরে রাজা একদিন দলবলসহ পদব্রজে নদীতীরে ভ্রমণ করতে যাচ্ছিছেন, এমন সময় সন্মুখের এক উচ্চ বৃক্ষের উপর হতে ভগবানের ‘মহারাজ মহারাজ’ এই আহ্বান শুনতে পেয়ে সেই বৃক্ষের দিকে তাঁকালেন। পারিষদগণ জানতে পেরে সকলে একবাক্যে বলে উঠলো মহারাজ পলায়ণ করুণ, ভগবান মরে ভূত হয়েছে। এই বলে সকলে রাজাকে ফেলেই পলায়ন করলো। রাজাও তখন তাদের পিছু পিছু পালিয়ে গেলেন৷

রাজা বুঝতে পারলেন না, কিন্তু ভগবান ঠাকুর ঠিক বুঝলেন, দশচক্রে তিনি ভূত হয়েছেন৷ (তা হ’তে) দশজনে অর্থাৎ বহুলোকে এক জোট হয়ে চেষ্টা করলে জীবিতকে মৃত, হয়কে নয় প্রতিপন্ন করতে পারে। গ্রাম্য ব্যবহারে ভুলক্রমে ভগবান শব্দে ঈশ্বর অর্থ করে দশচক্রের শক্তি বৃদ্ধি করে৷

দ্বিতীয় কাহিনীটি হলো—

ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুসমূহের মূল উপাদানকে ভূত বলা হয়৷ ভারতীয় দর্শনমতে ক্ষিতি অপ্ তেজঃ মরুৎ ও ব্যোম এই পঞ্চভূতে পৃথিবীর সৃষ্টি৷ ভূত শব্দের আরেক অর্থ মূর্তি, হিন্দিতে ভূত মূর্তি অর্থেই ব্যবহৃত হয়৷

বৈদিক যুগে মুর্তিপূজার প্রচলন ছিল না৷ কিন্তু অনেক প্রিয় ও পূজনীয় মানুষের মৃত্যুর পর তাদের অনুসারীরা চিন্তা করলেন, পূজ্যপাদের একটি মূর্তি নির্মাণ করতে পারলে তাকে দীর্ঘদিন স্মরণীয় করে রাখা যাবে৷ যেমন ভাবনা তেমনি কাজ৷ ভগবান তো আসমানবাসী কেউ নন, তিনি মানুষের মাঝেই জন্মলাভ করে মানব জীবন যাপন করে মৃত্যুবরণ করতেন৷ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, ভগবান হরিশ্চন্দ্র সকলেই মরলেন৷

মানুষ এই সকল ভগবানদের মূর্তি তৈরী করে রাখলেন এবং ভগবান বা শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে যেমন সম্মান প্রদর্শন করতেন, সুখ-দুঃখ ভগবানের সমীপে জানাতেন তেমনি মৃত ভগবানকে উদ্দেশ্য করে তার মূর্তিকে সম্মান জানানো বা মূর্তির নিকট সুখ-দুঃখাদি জ্ঞাপন করতে লাগলেন৷ এভাবেই একেশ্বরবাদী বৈদিক সমাজে তেত্রিশকোটি দেবতার বা ভগবানের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হলো৷ অর্থাৎ সমাজের দশজনের চক্রান্তে ভগবান বা অদৃশ্য পরমাত্মা ভূতে পরিণত হলেন৷

উৎস

  • – সংস্কৃত প্রবাদ ভগবান ভূততাং গতঃ-এর বাংলা অনুবাদ৷