অ-কার

অকার, অ-কার

বিশেষ্য

  • ‘ বর্ণ বা ধ্বনি।

বুৎপত্তি

  • বাংলা, +কার (স্বার্থে)।

সংজ্ঞা

বাংলা বর্ণমালার আদ্যবর্ণ; আলিকালির আদ্য অক্ষর; আদ্য স্বর। ব্যঞ্জনবর্ণে যুক্ত হলে অন্যান্য স্বর রূপান্তর প্রাপ্ত হয়, কিন্তু অকারের চিহ্ন থাকে না (ক্ + অ = ক)। উচ্চারণ স্হান কণ্ঠ, তাই কণ্ঠ্যবর্ণ।

পাণিনির মতে অকার দুই প্রকার। সংবৃত ও বিবৃত।

সংবৃত অ-কারের উচ্চারণে গলনালীর সঙ্কোচ এবং বিবৃত অ-কারের উচ্চারণে গলনালীর বিবার অর্থাৎ প্রসারণ করতে হয়। অ-কার উচ্চারণে সংবৃত কিন্তু সন্ধিপ্রভৃতি প্রক্রিয়ায় বিবৃত (পাণিনি ১.১.৯)।

মাত্রাভেদে অকার তিন প্রকার। যথা:

  • একমাত্রাবিশিষ্ট বা হ্রস্ব অ-কার।
  • দ্বিমাত্র বা দীর্ঘ উচ্চারণে আ-কার
  • ত্রিমাত্র বা প্লুত উচ্চারণে প্লুত অ-কার হয়।

এইরূপ মাত্রাভেদ থাকলেও এই ত্রিবিধ অ-কার সবর্ণ। সংস্কৃতে এই অ-ত্রয়ের আবার দু’টি করে মোট ছয়টি বিভাগ রয়েছে। যথা:

  • হ্রস্ব সানুনাসিক
  • হ্রস্ব নিরনুনাসিক
  • দীর্ঘ সানুনাসিক
  • দীর্ঘ নিরনুনাসিক
  • প্লুত সানুনাসিক
  • প্লুত নিরনুনাসিক

 বাংলায়ও অ-ত্রয় কণ্ঠজাত, সুতরাং কণ্ঠ্য বর্ণ; কিন্তু সংস্কৃতের ন্যায় বাঙলায় আ-কার দীর্ঘ নহে; অ-কারের ন্যায় হ্রস্ব। সুতরাং কেবল আকৃতিতে বাংলায় অ-কার ও আ-কার, সানুনাসিক ও নিরনুনাসিক ভেদে চতুর্ব্বিধ। যথা:

  • লঘু বা স্পৃষ্ট। অর্থ, অদ্বৈত ইত্যাদির অ।
  • স্পষ্ট। অতল, অজ, অন্যায় ইত্যাদির অ।
  • লঘুতর বা অর্দ্ধব্যক্ত ওকারের মত। কলিকা, রজনী, ললিত ইত্যাদির ক্, জ্, ল্ সংযুক্ত অ = অ, ক, জ, ল);
  • পূর্ণব্যক্ত ওকারবৎ (অতিশয়, অনুরোধ ইত্যাদির অ বা মন, যদু ইত্যাদির ম্, য্ সংযুক্ত অ = ‘ওতিশয়’, ‘ওনুরোধ’, ‘মোন’ এবং ‘যোদু’)।

প্লুত অ-কার ও আ-কার ‘গান’ ‘আহ্বান’ প্রভৃতিতে উচ্চারিত হয় মাত্র, এদের ভিন্ন লিখিত আ-কার বাঙলায় নেই।

সংস্কৃতের অন্য স্বরও হ্রস্ব দীর্ঘ প্লুত উচ্চারিত হয়; কিন্তু বাঙলায় দীর্ঘ স্বর, হ্রস্ব স্বরের ন্যায় উচ্চারিত হয় বলে, বাঙলায় অ-ত্রয়ের ন্যায় অন্য হ্রস্ব দীর্ঘ স্বরেরও উচ্চারণগত কিঞ্চিৎ প্রভেদ আছে। হিন্দী, মরাঠী, ব্রজবুলি প্রভৃতি ভাষার অ-কার ঈষৎ স্পৃষ্ট বা লঘু আকারের ন্যায় উচ্চারিত, তাই ‘অতি’ অনেকটা ‘আতি’র মত। প্রাচীন বাংলায়-‘অতি’ স্হলে ‘আতি’র প্রয়োগও দৃষ্ট হয়। আধুনিক শুদ্ধ উচ্চারণ ‘ওতি’। ‘অজ’র ‘অ’ উচ্চারণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণগুলির অকারান্ত উচ্চারণ় বাংলা ভাষারই বিশেষত্ব। প্রাচীন বাঙলায় চর্য্যাপদে ‘আঙ্গন’ ‘আস্তে’ (অস্তে) ইত্যাদির ও শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তনে ‘আচেতন’ ‘আর্জ্জুন’ ‘আনেক’ প্রভৃতি শব্দের আ-কার ঐরূপ উচ্চারণমূলক। আধুনিক বাঙলায় ‘আগণা’ ‘আচযা’ ‘আতেলা’ ‘আলুণি’ প্রভৃতির আ-কার ঐরূপেই হয়েছে। সংস্কৃতের ‘শ্বাপদ’ ‘বিশ্বামিত্র’ প্রভৃতির এবং প্রাকৃতের ‘মাণংসী’ (মনস্বী) ‘পারোহ’ (প্ররোহ) ইত্যাদির আ-কার ঐরূপে দীর্ঘ। এছাড়া বাঙলায় অ-কারের ও-কারবৎ উচ্চারণ আছে; ‘অনুচর’ ‘অমনি’ ‘রসুই’ ‘লক্ষণ’ ইত্যাদি ইহার উদাহরণ।

সাধারণত অ এর পরে অকার বা আকারযুক্ত ব্যঞ্জন থাকলে অকারের উচ্চারণ বজায় থাকে (অজ, অজা); ি, ী, ু, ূ, যুক্ত ব্যঞ্জন থকিলে ওকারবৎ (অতি, অতীত, অরুণ) এবং পরে ো থাকিলে অ (অতো, অহো)।

সংস্কৃত অভিধানে ‘অ’র হ্রস্ব, দীর্ঘ, প্লুত, অননুনাসিক, উদাত্ত, অনুদাত্ত, স্বরিত ইত্যাদি ১৮ প্রকার উচ্চারণ ও স্বরভেদ রয়েছে।