গল্পে গাথায় ছন্দে বাংলা স্থাননাম

গল্পে গাথায় ছন্দে
বাংলা স্থাননাম*
সংকলক
সমরেন্দ্ৰনাথ চন্দ

ইতিপূর্বে গবেষণামূলক একটি পরিকল্পনার কাজ করবার সময় নদিয়া জেলার ‘চাকদা’ নামক স্থাননামের বুৎপত্তি সম্বন্ধে একটি রোচক গল্প নজরে আসে। ভগীরথ রথে চেপে স্বর্গীয় নদী গঙ্গাকে পথ দেখিয়ে পৃথিবীতে নিয়ে আসছেন। লক্ষ্য কপিল মুনির আশ্রম, যেখানে মুনির শাপে ভগীরথের পিতৃপুরুষগণের শাপদগ্ধ ভস্ম ও আত্মা গঙ্গার জলস্পর্শে উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছে। লক্ষ্যস্থানের কাছাকাছি এসে হঠাৎ এক জায়গায় ভগীরথের রথের একটি চাকা (চক্র) ভেঙে পড়ল এবং সেই আকস্মিক দুর্ঘটনার চাপে পথে এক বিরাট ‘দহ’র সৃষ্টি হল। গঙ্গার অগ্ৰগতি কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইল। রথের ‘চক্র’ বা চাকা পুনরুদ্ধার হলে গঙ্গা আবার গতিশীল হল। রথের ‘চক্ৰ’ দ্বারা সৃষ্ট ‘দহ’ থেকে স্থানটি ‘চক্রদহ’ নামে পরিচিত হল। কালক্রমে লোকমুখে ‘চক্রদহ’, ‘চাকদহ’ বা ‘চাকদা’ নামে পরিবর্তিত হয়।

এইরকম পৌরাণিক গল্প বা কিংবদন্তির খোঁজ করতে গিয়ে বাংলার স্থাননাম সম্বন্ধে বেশ কিছু চমকপ্রদ গল্প-গাথা এবং তথ্য হাতে এল। সেই তথ্য এবং গল্পসমূহ থেকেই এই সংকলনের পরিকল্পনা। এই বিষয়ে অনুসন্ধানকালে অনেক বিশিষ্ট গবেষকদের লেখা পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রবন্ধ ও গ্রন্থ পর্যালোচনা করার সুযোগ পেয়েছি। তথ্যপূর্ণ সেই সকল গ্রন্থগুলি প্রধানত স্থাননামের ভাষাতত্ত্বের বিন্যাস হলেও অনেকাংশে আমার এই নগণ্য প্রকল্পের রসদ সেইসব গ্রন্থাদি থেকেই আহৃত।

পশ্চিমবঙ্গে প্ৰায় বিয়াল্লিশ হাজার গ্রাম ও শহর আছে। সেই সকল স্থাননামের পেছনে লুকিয়ে আছে না জানি কতই না ইতিহাস, কিংবদন্তি অথবা পৌরাণিক কাহিনি। দুর্ভাগ্যবশত বৈচিত্ৰ্যময় এই বিশাল নামের তালিকা থেকে সামান্যতম কিছু গল্প-গাথা আমি প্রাপ্ত গ্রন্থাদি থেকে সংগ্রহ করতে পেরেছি। (গ্ৰন্থপঞ্জি দেখুন) এই প্রকল্প সম্বন্ধে আমি মৌলিকতার দাবি রাখি না। এটা একটা কষ্টার্জিত সংকলন মাত্র। মনে বাসনা জাগে গ্রামবাংলার প্রতিটি গ্রামে গ্রামে গিয়ে স্থাননামের ইতিহাস বা কিংবদন্তির খোঁজ করি। কিন্তু বয়সের ভার এবং একক প্রচেষ্টায় সে অসাধ্য সাধন সম্ভব নয়। যদি কোনও উদ্যোগী যুবক বা প্ৰতিষ্ঠান এই কাজে এগিয়ে আসে। তবে সে সম্ভবত বাংলার ইতিহাসের অন্তর্নিহিত রহস্যময় যখের ধনের অলৌকিক ভাণ্ডারের সন্ধান পাবে।

এই প্রকল্পে কাজ করার সময় স্থাননামের সঙ্গে যুক্ত পুরনো কালের অনেকগুলি প্রচলিত ছড়া হাতে এল। বৈচিত্র্যের দিক থেকে সেই ছড়াগুলি যেমনই অনন্য, তেমনই বাংলার লোকসংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামোর এক অনবদ্য রেখাচিত্র তুলে ধরে। উদাহরণস্বরূপ—

ছাজা, রাজা, কেশ,

তিন মে বাংলা দেশ। (ছাজা – ঘর ছাওয়ার রীতি।)

* * *

উতরের মানুষ ভিতরে বুদ্ধি,

দখিনের মানুষ সাদা।

পূবের মানুষ চাঁদ সদাগর,

পছিমের মানুষ গাধা॥

কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্থাননামের বুৎপত্তির হদিশ না পাওয়া গেলেও স্থান সম্পর্কিত ছড়া মাত্র পাওয়া যায়। যথাস্থানে সেইসব ছড়াও উদধূত হয়েছে। কোনও কোনও ছড়ায় একাধিক স্থানের উল্লেখ থাকায় স্থান বিশেষের শিরোনামায় সেই ছড়াগুলির পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। প্রত্যেক নামের সঙ্গে জেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


  • গ্রন্থের ভূমিকা অংশ থেকে গৃহিত৷