শব্দবৃত্তি

অভি পূর্ব্বক ধারণ যাহাতে তাহাকে অভিধা কয়,
কোনো শব্দের অভিধা অর্থ শব্দনিষ্ঠ হয়।
অভিধা যাহাতে অন হয়ে যায় তাকে অভিধান বলে,
ক্রিয়াভিত্তিক অভিধান পেলে পড়িব নিদ্রা ভুলে। ১।
লক্ষণা লক্ষণের আধার, তাতে লক্ষণ রয়;
লক্ষণার্থে আঁকোড়তলার মানে আদালত হয়।
বিষ্ণুপুরের আদালতে আছে একটি আঁকোড় গাছ,
চল ছুঁড়ি তোকে নিয়ে যাব সেই আঁকোড় গাছের কাছ। ২।
ব্যঞ্জনা নামে আরও একখানি শব্দবৃত্তি রয়,
সোজা কথাটির বাঁকা মানে হলে তাকে ব্যঞ্জনা কয়।
ব্যঞ্জনার্থে অভিদাদি ছাড়া ভিন্ন অর্থ পাই;
‘স্নান করিয়াছি’ বাক্যের মানে হতে পারে ‘ ভাত চাই।’ ৩।

—- বর্ণসঙ্গীত থেকে সঙ্কলিত।

টীকা :

১. শব্দবৃত্তি মানে শব্দের অর্থ প্রকাশ করার শক্তি। বৃত্তি শব্দের অর্থ হল কাজ বা পেশা। অর্থকে প্রকাশ করাই শব্দের কাজ, তাই তাকে শব্দবৃত্তি বলে। শব্দের ত্রিবিধ বৃত্তি — অভিধা, লক্ষণা ও ব্যঞ্জনা।

শব্দকে ভেঙে যে আক্ষরিক অর্থ পাওয়া যায় তাকে অভিধা অর্থ (literal meaning) বলে। এই অর্থ ক্রিয়া ও বর্ণভিত্তিক হয়। যে গ্রন্থে শব্দের অভিধা অর্থ বলে দেওয়া হয় তাকে অভিধান (=অভিধা অন হয় যাহাতে) বলে। শব্দকে প্রকৃতি-প্রত্যয় এবং প্রয়োজনে বর্ণে ভেঙে তার অভিধার্থ নিষ্কাশন করা যায়। ব্যাকরণে বলা হয় যে রূঢ় শব্দের অভিধার্থ হয় না। কিন্তু নিরুক্ত তথাকথিত রূঢ় শব্দেরও অভিধা অর্থ নিষ্কাশনের চেষ্টা করতে পারে।

পাশ্চাত্যের পণ্ডিতেরা (এবং তাদের দেখাদেখি কিছু বাঙালী পণ্ডিতও) এই ব্যাপারটি ভাল করে না বুঝে শব্দার্থ যাদৃচ্ছিক (Word meanings are arbitrary) বলে ঘোষণা করেছেন। ‘বর্ণসঙ্গীত’ স্পষ্টাক্ষরে ঘোষণা করেছে যে শব্দার্থ যাদৃচ্ছিক নয়, তা স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক এবং শব্দার্থের দর্শনে ভারতবর্ষের অর্জ্জন পাশ্চাত্যের তুলনায় অনেক বেশী।

২. আমাদের পাঁচাল গ্রামের (জেলা বাঁকুড়া) মহিলারা ঝগড়ার সময় একে অন্যকে ‘তোকে আঁকোড়তল দেখাবো লো!’ বলে গালি দেয়। এখানে আঁকোড়তল শব্দের অর্থ হল বিষ্ণুপুর শহরের আদালত, যেখানে একটি আঁকোড় গাছ আছে। চোখ হলুদ হওয়া লক্ষ্য করে ডাক্তারবাবু যেমন ভাইরাল হেপাটাইটিস (viral hepatitis) রোগ ধরতে পারেন তেমনি আঁকোড় গাছটি লক্ষ্য করে বিষ্ণুপুরের আদালতটি চেনা যায়। আদলত বোঝাতে আঁকোড়তল শব্দের প্রয়োগ লক্ষণার্থে প্রয়োগ হয়। প্রসঙ্গত, রোগলক্ষণগুলিকে ডাক্তারবাবু লক্ষ্য করেন বলেই সেগুলিকে লক্ষণ বলে। এখানেও শব্দার্থের ক্রিয়াভিত্তিকতা লক্ষ্য করুন।

৩. অভিধা বা লক্ষণা বাদ দিয়ে শব্দের আরও ভিন্ন অর্থ হলে তাকে ব্যঞ্জনার্থ বলে। একে ভঙ্গীভাষণ বা বক্রোক্তিও বলা হয়।

লেখক

শ্রীশুভাশিষ চিরকল্যাণ পাত্র

কবি, গবেষক ও চিকিৎসক৷