বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান

043নাম: বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান
সঙ্কলক: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
প্রকাশক: বাংলা একাডেমী

মূল্যায়ণ: ১৯৬৫ সালে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান (পরবর্তী নাম বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান) প্রতিষ্ঠানটির এক ঐতিহাসিক অবদান। এই কীর্তির নেতৃপুরুষ ছিলেন নানা বিদ্যা ও ভাষায় অতুলনীয় পাণ্ডিত্যের অধিকারী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। তিনি নেতৃত্ব না দিলে এ ধরনের একটি বিশাল, জটিল ও শ্রমসাধ্য সূক্ষ্ম পাণ্ডিত্যপূর্ণ কাজ করা সম্ভব হতো কি না, বলা মুশকিল। ড. মুহম্মদ এনামুল হক, মুহাম্মদ আবদুল হাই, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, ড. কাজী দীন মুহাম্মদ প্রমুখ ভাষা বিশেষজ্ঞকে উপদেষ্টা করে এ কাজটি তিনি দক্ষ হাতে সম্পন্ন করেন।

পূর্ব পাকিস্তান একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়ে আত্মপ্রকাশ করলেও ড. শহীদুল্লাহ্ আঞ্চলিক ভাষার এই অভিধানের মাধ্যমে বাংলা ভাষা-সাহিত্য এবং বাঙালি জীবনের স্বকীয় চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যকেও এর মাধ্যমে ধারণ করার একটি দূরদর্শী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। কারণ, এই অভিধানে তাঁর ভূমিকায় বাংলা, বাঙালিত্ব এবং এ অঞ্চলের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রাচীন সাহিত্যে ‘বাংলা’ বা ‘বঙ্গাল’ নাম কোথায় কোথায় পাওয়া গেছে, সেগুলোই তিনি বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন। সেই পটভূমিকাতেই তিনি পশ্চিম ও পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক ভাষার বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য নির্ধারণের প্রয়াস পেয়েছেন। অতি সংক্ষেপে উপমহাদেশের এই অঞ্চলের বাংলা ও বাঙালির গুরুত্বও তুলে ধরেছেন। তিনি যা বলেছেন, তাতে বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চল প্রাচীনকালে বৌদ্ধ ধর্মের লীলাভূমি ছিল। এই বিষয়টি ময়নামতি, মহাস্থানগড় ও পাহাড়পুরের সভ্যতার উল্লেখ করে বোঝাতে চেয়েছেন। তিনি এ কথাও বলেছেন, বৌদ্ধ রাজারা দেশীয় ভাষার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সংস্কৃতেরও বিরোধী ছিলেন না। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ বা রাঢ় দেশে প্রথমে সুর রাজবংশ এবং পরে সেন রাজবংশ ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিল। সে জন্য তারা দেশি ভাষাকে অবজ্ঞা করত, উৎসাহ দিত সংস্কৃত ভাষার চর্চা ও বিকাশের। এ কারণে প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের সূচনা বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ বা প্রাচীন রাঢ় বঙ্গে হয়নি। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশ অর্থাৎ বরেন্দ্র এবং বঙ্গ—যাকে একসময় পূর্ববঙ্গ এবং বর্তমানে বাংলাদেশ বলা হয়, সেখানেই হয়েছে। বাংলা ভাষার এই উৎস মুসলমানদের এ অঞ্চল অধিকারের আগেই। ১৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দে আমির খসরু দেশীয় ভাষাগুলোর মধ্যে গৌড় ও বঙ্গালের নাম উল্লেখ করেছিলেন। রাজা রামমোহন রায়ের বাংলা ব্যাকরণের নাম ছিল গৌড়ীয় ভাষার ব্যাকরণ। সে বিষয়টিও বিশেষভাবে অনুধাবন করার মতো।

‘বঙ্গাল’ শব্দটি রাজেন্দ্র চোলের একাদশ শতকের শিলালিপিতে ব্যবহূত হয়েছে। এই বঙ্গাল দেশের রাজার নাম ছিল ‘গোবিন্দ চন্দ্র’। তিনি চন্দ্র বংশীয় রাজা ছিলেন। অতএব ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র মতে, প্রাচীন বাংলা ভাষার উদ্ভব বর্তমান বাংলাদেশ বা তৎকালীন প্রাচীন বঙ্গের বরিশাল, ফরিদপুর বা তৎসংলগ্ন অঞ্চলে। নাথ যোগীদের সাহিত্য এ অঞ্চলে সূচনা হয় বলে মনে করা যেতে পারে।

দুই
বাংলা একাডেমী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র সম্পাদকতায় এই গুরুত্বপূর্ণ কাজে যে হাত দিয়েছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলা ভাষার আদর্শ অভিধান রচনার সূত্রপাত করা। আগে যেসব বাংলা অভিধান রচিত হয়েছিল, তাতে এভাবে মূল থেকে বাংলা ভাষার অভিধান রচনার কাজ করা হয়নি। অতএব বাংলা একাডেমীর এই কাজের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছিল অসাধারণ। কাজটি শেষ করে বাংলা একাডেমী একটি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান প্রণয়নের কাজেও হাত দেয়। আগে আঞ্চলিক ভাষার অভিধান-এর কাজটি করে নেওয়ার ফলে ব্যবহারিক অভিধান একটি মৌলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে—এটাই ছিল সেকালে পূর্ব বাংলার পণ্ডিতদের পরিপক্ব বোধ।

কিন্তু এই কাজ তো সহজ ছিল না। পূর্ববঙ্গ এবং পশ্চিমবঙ্গের উপভাষার মধ্যে পার্থক্য অনেক। বলা চলে, পশ্চিম বাংলায় একটি বিরাট অঞ্চলে প্রায় একই রকম কথ্যভাষা তখন গড়ে উঠেছে। প্রধানত নদীয়ার ভদ্রলোকের ভাষাকে অবলম্বন করে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা, হুগলি, বর্ধমান—এইসব শহর অঞ্চলের শিক্ষিতজনের মধ্যে কথ্য বুলিতে খুব ফারাক ছিল না। বোধগম্যতার ক্ষেত্রেও তেমন কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু পূর্ব বাংলা এদিক থেকে একেবারেই আলাদা। পূর্ব বাংলায় বিশেষ কোনো অঞ্চলের ভাষাই সাধারণ ভাষার রূপ পরিগ্রহ করেনি। তা ছাড়া সিলেট, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী এমনকি বরিশাল অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গেও যে বিশাল পার্থক্য, তাতে এখানে একটি সমধর্মী বা ইউনিফর্ম ভাষা শিক্ষিত লোকেদের মধ্যেও প্রচলিত নাই। সহসা এমনটি হবে, এ রকম সম্ভাবনাও নাই। সে কারণেই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত আপাত বিভিন্ন ভাষারূপের প্রকৃতি নিরূপণ ও প্রবহমানতা বিশ্লেষণ করার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, এটি অনুপুঙ্খভাবে করা গেলে বাংলাদেশের ভাষার মূল প্রবণতাগুলো বোঝা সম্ভব হবে এবং তারই ভিত্তিতে একটি আঞ্চলিক ভাষার অভিধান করা যথাযথ। এই আঞ্চলিক ভাষার অভিধানের ওপর ভিত্তি করেই একটি ব্যবহারিক অভিধান রচনা করা সমীচীন হবে। কারণ নতুন ব্যবহারিক অভিধানে আঞ্চলিক ভাষার অন্তর্ভুক্তিতে অভিধান সমৃদ্ধ হয় এবং এক অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা অনেক অঞ্চলের কাছে গৃহীত হয়ে থাকে। শহীদুল্লাহ্র এই প্রয়াসটি ইতিহাসবোধসম্পন্ন এবং ভাষা বিকাশের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও প্রবহমানতার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। সেই বিবেচনায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র আঞ্চলিক ভাষার অভিধান শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা বঙ্গদেশের জন্যই এক মূল্যবান কীর্তি। এসব দিক বিবেচনা করেই বাংলা ভাষার অসামান্য পণ্ডিত ও ঐতিহাসিক ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র আঞ্চলিক ভাষার অভিধানকে তাঁর ‘ম্যাগনাম ওপাস’ বা ‘মহাগ্রন্থ’ বলে আখ্যাত করেছিলেন।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র এই আঞ্চলিক ভাষার অভিধান গত শতাধিক বছরের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদই শুধু নয়, দিকনির্দেশক মহাগ্রন্থও বটে।

আঞ্চলিক ভাষার অভিধান বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উপভাষার একটি সংকলন গ্রন্থ। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সম্পাদনায় ১৯৬৫ সালে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষাসমূহের সংকলন-জাতীয় গ্রন্থ এটিই প্রথম।

বাংলা ভাষার বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ নিয়ে প্রথম গবেষণার পরিচয় পাওয়া যায় গ্রিয়ারসনের The Linguistic Survey of India (১৯০৩-১৯২৮) নামক গ্রন্থে। এর প্রথম খন্ডে বাংলাদেশের উপভাষা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। বাংলাদেশের আঞ্চলিক অভিধান রচনার প্রথম প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন এফ.ই পার্জিটার তাঁর Vocabulary of Peculiar Vernacular Bengali Words (১৯২৩) নামক গ্রন্থের মাধ্যমে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষাসমূহের একটি সংকলন প্রকাশ করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয় এবং এ উদ্দেশ্যে বাংলা একাডেমীর তত্ত্বাবধানে তিন খন্ডে সমাপ্য একটি অভিধান প্রণয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ১৯৫৮ সালের প্রথম দিকে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, উচ্চ বিদ্যালয়, সাময়িক পত্রিকা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নিকট আবেদনপত্র প্রেরণের মাধ্যমে শব্দ সংগ্রহ করা হয়। ঢাকা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, খুলনা, পাবনা, সিলেট, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, রংপুর, যশোর, বাখেরগঞ্জ, বগুড়া, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, নোয়াখালী, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও করাচি অঞ্চল থেকে ৪৫৩ জন সংগ্রাহকের মাধ্যমে মোট ১,৬৬,২৪৬টি আঞ্চলিক শব্দ সংগৃহীত হয়। সংশোধন ও বিচার-বিবেচনার পর এ থেকে প্রায় পঁচাত্তর হাজারের মতো শব্দ সংকলনের জন্য গৃহীত হয়।

১৯৬০ সালের ডিসেম্বর থেকে সংকলনের কাজ শুরু হয়। ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক, মুহম্মদ আবদুল হাই, মুনীর চৌধুরী এবং ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদকে নিয়ে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠিত হয়। এর সভাপতি ছিলেন বাংলা একাডেমীর তৎকালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান।

অভিধানটির তিন খন্ডের বিষয় পরিকল্পনা ছিল, প্রথম খন্ড: আঞ্চলিক ভাষার অভিধান। এর বিষয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবহূত শব্দাবলির সংগ্রহ। দ্বিতীয় খন্ড: ব্যবহারিক বাংলা অভিধান। এর বিষয় বাংলা সাহিত্যে বিশেষত পূর্ব পাকিস্তানি সাহিত্যে ব্যবহূত শব্দাবলির সংকলন। তৃতীয় খন্ড: বাংলা সাহিত্যকোষ। এর বিষয় বাংলা সাহিত্যে ব্যবহূত বিশেষার্থক শব্দ, প্রবাদ-প্রবচন, উপমা, রূপক, উল্লেখ ও উদ্ধৃতি এবং মুসলমান সাহিত্য-সাধকদের সংক্ষিপ্ত জীবনী।

সাত বছরের প্রচেষ্টায় (১৯৫৮-১৯৬৪) সহস্রাধিক পৃষ্ঠার এ মহাগ্রন্থের প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ সালে। ১৯৭৩ সালে এর দ্বিতীয় মুদ্রণ এবং ১৯৯৩ সালে ১,০৫৮ পৃষ্ঠায় এর প্রথম পুনর্মুদ্রণ প্রকাশিত হয়। সর্বাধিক আঞ্চলিক শব্দের সংগ্রহ এ অভিধান পরবর্তীকালের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিরাট প্রভাব বিস্তার করে।

প্রতিক্রিয়া

প্রতিক্রিয়া