ধরাধর

পর্ব্বত ধরা ধরে রাখে বলে তাকে ধরাধর কয়,
মহাকর্ষের টানে সব কণা ধরাধরি করে রয়।
পর্ব্বতগুলি নিজ ভার দিয়ে পৃথিবী রেখেছে ধরে,
তবু এই ধরা ভূমিকম্পনে বার বার উঠে নড়ে।

— বর্ণসঙ্গীত, ধরাধরি, ৩।

পর্ব্বতশৃঙ্গের উচ্চতা এবং ভূকম্পনের কারণ :
কোনো গ্রহে পর্ব্বত শৃঙ্গের সর্ব্বোচ্চ উচ্চতা কত হবে তা নির্ভর করে শিলার স্থিতিস্থাপকতা এবং ঐ গ্রহের পৃষ্ঠে অভিকর্ষজ ত্বরণের ( g-এর) মানের উপর। হিমালয় পর্ব্বতের সর্ব্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেষ্টের উচ্চতা প্রায় ৮.৮ কিমি। খুব সহজ অঙ্ক কষে দেখানো যায় যে পৃথিবীপৃষ্ঠে এভারেষ্টের চেয়ে উঁচু পর্ব্বতশৃঙ্গ সম্ভব নয়। ভূপৃষ্ঠে এভারেষ্টের চেয়ে উঁচু শৃঙ্গ বানালে তা নিজের ভারে ভেঙে পড়বে।

mount_everest

ছবিতে হিমালয় পর্ব্বত

মহাসাগরের জলের তলায় প্লবতার কারণে সব জিনিষ হালকা হয় বলে সেখানে এভারেষ্টের চেয়ে উচ্চশৃঙ্গ সম্ভব হয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরের নীচে একটি ১০.২ কিমি উঁচু পর্ব্বত শৃঙ্গ আছে, যা ডাঙায় সম্ভব নয়। জলে নিমজ্জিত বলেই এই শৃঙ্গটি এভারেষ্টের চেয়েও উঁচু হতে পেরেছে। এই পর্ব্বতশৃঙ্গের নাম Mauna Kea, এটিই পৃথিবীর উচ্চতম পর্ব্বতশৃঙ্গ। তবে এটি জলে নিমজ্জিত বলে আমরা এভারেষ্টকেই পৃথিবীর উচ্চতম পর্ব্বতশৃঙ্গ বলে জানি।

মঙ্গল গ্রহে g-এর মান কম বলে সেখানে আরও উঁচু পর্ব্বতশৃঙ্গ সম্ভব। বাস্তবিক মঙ্গলে এভারেষ্টের চেয়েও অনেক উঁচু পর্ব্বতশৃঙ্গ আছে। সেই শৃঙ্গের নাম mons olympus। এটি সৌরজগতের সর্ব্বোচ্চ পর্ব্বতশৃঙ্গ এবং এর উচ্চতা প্রায় ২২ কিমি, যা মাউন্ট এভারেষ্টের প্রায় ৩ গুণ।

পর্ব্বতকে ধরাধর, ভূধর, মহীধর, গোত্র ইত্যাদি বলে। এর কারণ এখানে খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। মনে করুন টেবিলের উপর একটি কাগজ আছে। সেটা যাতে উড়ে না যায় সেজন্য আপনি একটা ওজন (paper weight) তার উপর চাপা দেন। একইভাবে সমগ্র এশিয়া এবং ইউরোপ পৃথিবীর উপর একটা প্লেটের মতো ভাসছে (এই প্লেটকে ‘ইউরেশিয়া’ বলতে পারি)। হিমালয় পর্ব্বতমালা একটি paper weight-এর মতো এই প্লেটটিকে চাপা দিয়ে রেখেছে। এই ভাবে পর্ব্বতমালাগুলির ওজন ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন প্লেটগুলিকে ধরে রাখে। তাই ক্রিয়াভিত্তিক নিয়মে পর্ব্বতকে ভূধর বা ধরাধর বলে। তবু যদি ঐ প্লেটগুলি নড়ে উঠে তো ভূমিকম্পন হয়। আমাদের পূর্ব্বপুরুষেরা যখন পর্ব্বতকে ধরাধর বলেছিলেন তখন তারা বিষয়গুলি এইভাবেই বুঝেছিলেন বলে আমার মনে হয়েছে।

যা পর্ব্বে পর্ব্বে গড়ে ওঠে তাকে পর্ব্বত বলে। আগেই বলেছি যে পর্ব্বতকে গোত্রও বলে। এর কারণ কি? এখানে গো মানে পৃথিবী, গোত্র মানে যা পৃথিবীকে ত্রাণ করে। পৃথিবীকে রক্ষা করে বলেই পর্ব্বতকে গোত্র বলে।

গোত্র মানে পর্ব্বত ছাড়া মানুষের বংশধারা এবং সন্তানও হয়। বংশধারাকে গো বলে (ক্রিয়াভিত্তিক নিয়মে গো মানে ‘যে যায়’) এবং সন্তান সেই বংশপ্রবাহকে ধরে রাখে বলে সন্তানকেও গোত্র বলে। এছাড়া গোশালাকেও গোত্র বলে কারণ তা বহু গরুকে একসঙ্গে ধরে রাখে (এখানে গো মানে গরু বলে বুঝতে হবে)। গো শব্দের সর্ব্বমোট প্রায় ৩৬টি অর্থ আছে তা ‘গো‘ কবিতায় বলা হয়েছে।

ওষুধ বিজ্ঞানে একই বংশের সমস্ত ওষুধেরও একটি গোত্রনাম (generic name) থাকে। যেমন ধরুণ ciprofloxacin, norfloxacin, ofloxacin ইত্যাদি ওষুধগুলি fluroquinolone গোত্রের অন্তর্গত। মানুষের যেমন কাশ্য়প, শাণ্ডিল্য ইত্যাদি গোত্রনাম থাকে (এগুলি এক একটি মুনিঋষির বংশধারার নাম) ওষুধের গোত্রনামও সেইরকম। দুঃখের বিষয় যে আজকাল আমাদের অনেক ডাক্তার বন্ধু গো এবং গোত্র কথার মানে ভাল করে না জানার ফলে ওষুধের অবাণিজ্যিক নামকে গোত্রনাম বলে ভুল করছেন। আরও দুঃখের বিষয় হল এই নিয়ে বার বার অভিযোগ জানালেও তাদের কেউ কেউ নিজেদের সংশোধন করতে চাইছেন না। তাঁরা প্রেসকৃপশনে ওষুধের brand name না লিখে তথাকথিত ‘গোত্রনাম’ (আসলে ‘গোত্রনাম’ না বলে ‘অবাণিজ্য়িক নাম’ বলা দরকার) লিখতে চান এবং সেই ব্যাপারে বর্ত্তমান লেখকও তাঁদের সঙ্গে সহমত। প্রকৃত অর্থে গোত্রনামে যে কখনও ওষুধ লেখা সম্ভব নয় (কারণ একই গোত্রনামে অনেকগুলি ওষুধ থাকে) এটা সহজেই বোঝা যায়। ব্যাকরণ না বুঝে ভুল কথা বললে পাপ হয় এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গেও ব্যাকরণের বেশ ভাল সম্পর্ক আছে (সেই আলোচনা এখানে সম্ভব নয়)। গোত্র শব্দের অন্যান্য অর্থগুলি ‘গো‘ কবিতায় পাবেন।

পুরাণে আছে সর্পরাজ বাসুকি যখন পৃথিবীকে এক ফণা থেকে অন্য ফণায় স্থাপন করেন তখন ভূকম্পন হয়। অনেকে এইসব কথাকে স্রেফ কুসংস্কার বলে মনে করেন। এই বিষয়ে আমার একটু অন্যরকম ভাবনা আছে, সেটা এখানে খুব সংক্ষেপে বলছি। পুরাণকারদের এই বর্ণনায় সর্পরাজ বাসুকি বলতে প্রাচীন পুঁজিধারী সত্তাকে বুঝতে হবে। বসা শব্দের অর্থ হল চর্ব্বি বা মেদ। সমাজদেহের বসা বা উদ্বৃত্ত সম্পদ থেকে সর্পরাজ বাসুকির সৃষ্টি হয়। প্রসঙ্গত, খান-চক্রবর্তীর ‘সরল শব্দার্থকোষ’-এ সর্প মানে সরের (ধনসরের) পালক বা ধনপতি এবং প্রতীকী অর্থ সাপ (snake)। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যখন পরিবর্ত্তন হয় তখন সমাজ কেঁপে ওঠে, এই হতে পারে পুরাণকারদের কথার মানে। একটা সাপ পৃথিবীকে তার ফণায় নিয়ে নাচাবে, আমাদের পূর্ব্বপুরুষেরা এমনটা মনে করার মতো বোকা ছিলেন না। পৌরাণিক কবিরা যথেষ্ট প্রতিভাবান ছিলেন, আধুনিক পাঠকেরাই শব্দার্থের দর্শন (ক্রিয়াভিত্তিক স্বভাব) বিস্মৃত হয়ে তাঁদের কথার মানে বুঝতে পারেন না। পুরাণগুলি ক্রিয়াভিত্তিক ভাষায় লিখিত ইতিহাস এবং সেগুলির মানে বুঝতে গেলে পূর্ব্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধার দরকার। পর্ব্বতের ডানা এবং সন্তানসন্ততি থাকার বিষয়গুলিরও ব্যাখ্যা আছে। আগ্রহী পাঠকেরা খান-চক্রবর্তীর ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’ থেকে সেই ব্যাখ্যা দেখে নিতে পারেন।

আমি এখানে খুব সহজ করে বিষয়গুলি বলার চেষ্টা করেছি। ভূবিজ্ঞানী এবং পুরাণ বিশেষজ্ঞরা বিষয়গুলি আরও বিশদে আলোচনা করলে ভাল হয়।

লেখক:

শুভাশিষ চিরকল্যাণ পাত্র

কবি, চিকিৎসক, ক্রিয়া ও বর্ণভিত্তিক শব্দার্থ বিধি গবেষক।