গো

[মাত্র দু’টি আপাত নিরীহ বাংলা শব্দ – একটি হল ‘গো’, অপরটি হল ‘মাংস’। ‘গো’ শব্দের বহুরৈখিক ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক অর্থ হল – ‘যে যায়, অথবা ‘যাহা যায়’। অর্থাৎ অসীম/অনন্ত সংখ্যক চলমান সমস্ত কিছুকেই বোঝানো যায় এই একটি শব্দ দিয়েই। ঠিক যেমন ‘সে’ এই সর্ব্বনামটি দিয়ে অসীম/অনন্ত সংখ্যক চরাচরের সকল কিছুকেই বোঝানো যায়। অথচ প্রেক্ষিত অনুসারে উদ্দীষ্টকে নির্দ্দিষ্ট করে বুঝে নিতে আমাদের বিন্দুমাত্রও অসুবিধা হয় না। এদিকে গত আড়াইশ বছর ধরে পাশ্চাত্যের প্রতীকী লোগোসেণ্ট্রিক শব্দার্থতত্ত্বের প্রভাবে আমরা অজস্র বাংলা শব্দের মতো ‘গো’-শব্দকেও তার বহুরৈখিক অর্থভাণ্ডার ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে শুধুমাত্র ‘গরু’-কেই একমাত্র অর্থ হিসাবে অভিধানে স্থান দিয়েছি এবং বংশপরম্পরায় বাঙালী ছাত্রসমাজকে ‘গো’ শব্দের অর্থ হিসেবে একমাত্র ‘গরু’-কেই বুঝতে শেখানো হচ্ছে এবং হয়ে আসছে।

একই অবস্থা ‘মাংস’ (ম্‌+অ+অ+ং+স) শব্দের অর্থের ক্ষেত্রেও। ‘মাংস’ শব্দের ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক অর্থ হল – মাংস = সীমায়িত(ম্‌+অ) অস্তিত্বের(অ) রহস্যময়(ং) নির্য্যাস(স) যাহাতে। অথবা, সীমায়িত ‘আমি’-বোধের (মাম্‌-এর বা ‘আমার’) নির্য্যাসস্বরূপ মেধাশ্রম থাকে যাহাতে (যে উৎপন্নে); কিংবা ‘উহার ভিতরে আমার দেহ-মনের অংশ আছে, অতএব উহা আমার’ – উৎপন্নের উপর উৎপাদকের বা মেধাশ্রমদাতার এইরূপ বোধ যাহাতে; অথবা, উৎপন্নের উপর উৎপাদকের অধিকারবোধ বা স্বতন্ত্র মালিকানাবোধ যাহাতে; কিংবা, যৌথসমাজের উৎপন্নের বিতরণে জ্ঞানীর (বেদজীবীর) বিশেষ সুবিধা-সুযোগ বা মর্য্যাদা (বৈদিক যুগে) প্রতিষ্ঠিত হইলে যৌথসমাজের অন্যান্য সদস্যদের মনে যে স্বাতন্ত্র্যের বা ‘উৎপন্নের উপর অধিকারবোধ’-এর উদয় হইতে শুরু করে; অথবা, (সাদৃশ্যে) হাড়ে লেগে থাকা আঁশরূপ মাংস বা ফলের শাঁস (শক্তিপূর্ণ আঁশ) যাহাতে। ব্যক্তিমালিকানার বোধ, উৎপন্নের উপর উৎপাদকের অধিকারবোধ। সাদৃশ্যে – পিশিত, আমিষ, মৎস্য-পিশিত, ফলের শাঁস।” – (খান-চক্রবর্ত্তী রচিত “সরল শব্দার্থকোষ” থেকে)। এখানেও দেখা যাচ্ছে মাংসের বহুরৈখিক অর্থকে ফেলে দিয়ে শুধুমাত্র পশুকে হত্যা করে তার দেহের অংশকেই অর্থাৎ ‘ভোজ্য-মাংস’কে বোঝাতেই ব্যবহৃত হচ্ছে।

আমাদের প্রাচীন ঋষিবাক্য ছিল – ‘গো-মাংস ভক্ষণ করিও না’ কিংবা ‘বৃথামাংসভক্ষণ করিও না’ অর্থাৎ মানসিকভাবে গোমাংসভক্ষণ না করতে, ‘আরও পুঁজি’/’আরও লাভ/’আরও লোভ’ এই মানসিক ‘গো-মাংস’ভক্ষণকে বর্জ্জনের নির্দ্দেশ দিয়েছিলেন’। কিন্তু কখনও বাহ্যত ভোজ্য মাংস ভক্ষণ করা থেকে বিরত থাকার কোন নিষেধাজ্ঞা তাঁরা জারী করেন নি। প্রেক্ষিত অনুসারে ‘গো’ অর্থাৎ পণ্য (যৌথসম্পদের যে অংশ অতিরিক্ত/উদ্বৃত্ত) যা বিক্রয়ের জন্য ‘যায়’ এবং সেই পণ্যবিক্রলব্ধ ধনের উপর পণ্যবিক্রেতার (যৌথমালিকানার বিপরীতে ব্যক্তিমালিকের) অধিকারবোধসঞ্জাত প্রভূত ধনার্জ্জনকে অর্থাৎ বৃথামাংসভক্ষণ করাকে নিষেধ করা হয়েছিল। কিন্তু তথাকথিত ‘আধুনিক’ আমরা, শব্দের যথার্থ ভুলে গিয়ে শুধুমাত্র একরৈখিক-প্রতীকী-সাদৃশ্য অর্থবাচকতায় দুষ্ট ও অভ্যস্ত হওয়ার ফলে; এবং অতীতের সঙ্গে আত্মবিচ্ছেদের ফলে – জীবনের সর্ব্বত্র, কী ব্যক্তিজীবনে, কী সমাজজীবনে, এমনকি রাষ্ট্রীয় জীবনেও কতবড় সর্ব্বনাশা বিপদ ঘটতে পারে, সারা ভারত জুড়ে গোমাংসভক্ষণ-বিরোধিতার নামে অথবা গোরক্ষার নামে যে হত্যালীলা, অত্যাচার, স্বাধিকারহরণ এবং অপ্রীতিকর সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ঘটে চলেছে তার চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে?

খান-চক্রবর্ত্তী উদ্ভাবিত ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক শব্দার্থবিধিকে আত্মস্থ ও হৃদয়ঙ্গম করে কাব্যসাহিত্যে তার ফলিত রূপ ঘটিয়েছেন যিনি সেই ভাষাবিদ, জ্যোতিষশাস্ত্রবিদ, সুকুমার-বিশেষজ্ঞ এবং কবি শ্রীশুভাশিষ চিরকল্যাণ পাত্র রচিত বিশ্বের প্রথম পদ্যাভিধান “বর্ণসঙ্গীত” থেকে ‘গো’ কবিতাটি কবিকৃত টীকাসহ পাঠকদের উদ্দেশে প্রকাশ করা হল।]

‘গো’ —  শ্রীশুভাশিষ চিরকল্যাণ পাত্র

শ্রীখণ্ডদেব বলিয়া গেলেন গো মানে কত কী হয়;
গো পশু, স্বর্গ, ভূ, বাক, বজ্র – অমরকোষেতে কয়।
শুধু গরু নয়, গো মানে ‘যে যায়, ‘যা দিয়ে স্বর্গে যায়’;
বুঝে খণ্ডিত ‘গো’ধনের কথা বিশ্বকে বুঝা যায় ।১।

‘গো’ হল কিরণ, অক্ষি শব্দে রন্ধ্রতুল্য হয়;
দুই জুড়ে দিলে গবাক্ষ হয়, তাকে বাতায়ন কয়।
বড় ভাল লাগে সেই জানালায় সূর্য্যকিরণ এলে;
সেই কিরণেতে ভাসে ত্রসরেণু, দেখি তা অক্ষি মেলে ।২।

গো অথবা রোদ থেকে ত্রাণকারী ছত্ত্র গোত্ত্র হয়,
পর্ব্বত করে পৃথিবী রক্ষা, তাহাকে গোত্ত্র কয়।
গোশালা এবং বংশ গোত্ত্র, কোন সন্দেহ নাই;
সন্তান করে বংশ রক্ষা, গোত্ত্র হইবে তাই ।৩।

একসাথে বহু গো দান হইলে গোদ বলা হয় তায়;
অনেক বস্তু একসাথে জমে সে স্থান ফুলিয়া যায়।
লসিকার নালী রুদ্ধ হইয়া পা দু’খানি যায় ফুলে;
সে হল শ্লীপদ, রসজমা রোগ, গোদ নামে তাহা চলে ।৪।

গোদ-এর আধার গোদা হয়ে যায়, গোদা ছেলে খুব ভারী;
গোদা হতে পারে দলপতি আর যে করে মজুতদারী।
পালের গোদাকে ধরিতে পারিলে তবে বুঝি বাহাদুরি,
গো অথবা জল দান করে ওই বরণীয় গোদাবরী ।৫।

গোঁ মানে হইল একরোখাভাব, নির্ব্বন্ধাতিশয়।
গোঁ ধরিয়া চলে যায় গো যেজ্‌ন, তাহাকে গোঁয়ার কয়।
ওরা একরোখা, বড় একঝোঁকা, মহা ঝামেলায় ফেলে;
এঁড়ে গরুটির মতো দড়ি ছিঁড়ে গোঁয়ারেরা যায় চলে ।৬।

সব ‘গো’ বিষয়ে বিদিত যে জন সে তো গোবিন্দ হয়;
গোপাল কৃষ্ণ গোবিন্দ হয়, অমরকোষেতে কয়।
বৃহস্পতিও গোবিন্দ হয়, বলেন মেদিনিকার;
তবে গোবিন্দ গোঁয়ার হইলে, তাঁকে সামলানো ভার ।৭।

সদগোপগণ অতি প্রকাশ্যে পোষে, গোরু আর মোষ,
গোপেরা গোপনে পণ্য বেচিলে, তাতে হয় বুঝি দোষ?
গো পালন যদি অন হয়ে যায় তাহাকে গোপন কয়,
রাষ্ট্রের ভয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে পণ্যের বিনিময়। ।৮।

গো-এর পালন করে যেই জন তাহাকে গোপাল কয়;
গোপাল গোয়ালা, কৃষ্ণ, রাখাল এবং ভূপাল হয়।
বৃন্দাবনেতে কৃষ্ণ বাবাজী চরাত গরুর পাল-
অর্থাৎ কি না পণ্য পালন করিত নন্দলাল ।৯।

গোপিনী শব্দে গোপের আধার অথবা পত্নী হয়,
কংসের ভয়ে কৃষ্ণের কাছে ওরা আশ্রয় লয়।
বৃন্দবনেতে গিরি ছিল এক, নামটি গোবর্দ্ধন;
কৃষ্ণ তাহাকে ধরিল, হইল পণ্য উদ্গীরণ ।১০।

যজ্ঞে গোবর খাইতে হইবে, শাস্ত্রজ্ঞানীরা কয়;
তবে সে গোবর প্রকৃত অর্থে গরুর বিষ্ঠা নয়।
গো সেই দ্রব্য যাহা হাটে যায়, মূল্য তাহার পাই;
যজ্ঞের কালে কালে সেই মুল্যকে বরণ করিতে চাই ।১১।

গোবর খাইলে হইবে পুণ্য, গোমাংসে হয় পাপ;
মাংস নিজের মালিকানা, উহা সামাজিক অভিশাপ।
টাকার পাহাড় জমাইলে হয় গোমাংস ভক্ষণ,
বেশী মালিকানা কেহ কোনও দিন করিও না রক্ষণ ।১২।

গোলোকে প্রচুর ধনসম্পদ, সেই লোক তেজোময়;
শুধু গরু নয়, সেইখানে আরও নানা ধন জমা হয়।
সে গোলোকে বৈকুণ্ঠপুরীতে, বিষ্ণু বসিয়া রয়,
তবে তার মনে কুণ্ঠা হইলে সেও অবতার হয় ।১৩।

গবেষণা মানে জ্ঞানের এষণা, গরুর এষণা নয়;
রূপ-সনাতন মহাজ্ঞানী বলে ওরা গোস্বামী হয়,
গোস্বামিগণ, জ্ঞানের মালিক এবং দীক্ষাগুরু,
গরুতে গোবর সার দেয় আর জ্ঞানসার দেয় গুরু। ।১৪।

টীকা –

১। অমরকোষের গান্তুবর্গে গো শব্দের মানে বলতে গিয়ে বলা হয়েছে; “স্বর্গেষু পশুবাগ্বজ্রদিঙ্‌নেত্রঘৃণীভূজলে”। এর অর্থ হল গো শব্দের অর্থ স্বর্গ,পশু, বাক, বজ্র, দিক, নেত্র, ঘৃণি (সূর্য্য), ভূ (পৃথিবী), জল ইত্যাদি।

শ্রীহরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় গো (গম্‌+ও) শব্দের ক্রিয়াভিত্তিক অর্থ দিয়েছেন ‘যে যায়’। তারপর তিনি গো শব্দের প্রায় ৩২ টি প্রতীকী অর্থ দিয়েছেন, যথাঃ গোজাতি, গরু, বৃষ রাশি, সূর্য্য, চন্দ্র, গোমেধ যজ্ঞ, ইন্দ্রিয়, ঋষি-বিশেষ, গায়ক, গৃহ, ৯ সংখ্যা, গোজাতি স্ত্রী, ধেনু, দিক, বাক, বাক্যাধিদেবতা সরস্বতী, পৃথিবী, স্বর্গ, বজ্র, অম্বু, জল, আকাশ, রশ্মি, কিরণ, চক্ষুঃ, বাণ, লোম, কেশ, হীরক, গোসম্বন্ধী দুগ্ধগৃত চর্ম্মাদি, গৃহপালিত পশুগণ, সিংহ ইত্যাদি।

সুকুমার রায়ের ‘চলচ্চিত্ত চঞ্চরি’ নাটিকার শ্রীখণ্ডদেব মহাশয় ‘গো’ শব্দের বহু অর্থের ভাবে বিভোর হয়ে একটি সূত্র লিখেছেন যা তার আশ্রমের প্রাথমিক শ্রেণীর ছাত্ররাও সাধন ক’রে থাকেঃ সূত্রটি এইরকমঃ-

খণ্ডিত গোধন মণ্ডল ধরণী
শবদে শবদে মন্থিত অরণী,
ত্রিজগত যজ্ঞে শাশ্বত স্বাহা –
নন্দিত কল কল ক্রন্দিত হাহা
মৃত্যু ভয়াবহ হম্বা হম্বা
রৌরব তরনী তুহুঁ জগদম্বা
শ্যামল স্নিগ্ধা নন্দন বরণী।
খণ্ডিত গোধন মণ্ডল ধরণী।

গো শব্দের যতগুলি অর্থ হয় তারা সবাই কোনো না কোনো ভাবে যাওয়া (go) ক্রিয়াটির সঙ্গে যুক্ত। ইংরেজী go আর চীনা ‘ngo’ মানেও যাওয়া। এইভাবে গো শব্দ জপ করে শব্দার্থের আলোয় ব্রহ্মাণ্ডকে দেখার এক অখণ্ড দর্শন পাওয়া যায়। এজন্যই শ্রীখণ্ডদেব একটু বাড়াবাড়ি করলেও খুব একটা ভুল বলেননি। তবে তার সূত্রে যুক্তির চেয়ে উচ্ছ্বাস বেশী।

২। গো মানে কিরণ, অক্ষি মানে রন্ধ্র, ব্যাপ্তি গতিশীল যাহাতে; কিংবা দৃষ্টিকে বিষয় পর্য্যন্ত ব্যাপ্ত করিয়া লইয়া যায় যে অর্থাৎ নেত্র বা চক্ষু। গো ও অক্ষি শব্দের সন্ধি করলে হয় গবাক্ষ। গবাক্ষ মানে রন্ধ্র বা জানালা, যে পথ দিয়ে আলোক রশ্মি (গো) যায় (‘সরল শব্দার্থকোষ’)। সমাসবদ্ধ হওয়ার সময় অক্ষি শব্দটি অক্ষ হয়ে আয়। হরিচরণবাবুর অভিধানে ত্রসরেণু মানে ‘ত্রস (জঙ্গম) রেণু; গবাক্ষ্যন্তর্গত সূর্য্যকিরণে দৃশ্যমান চঞ্চল ধূলিকণা।’

৩। গোত্ত্র (গো+ত্রৈ+ও) ঃ- ‘পৃথিবীরক্ষক’ (পর্ব্বত), যে পূর্ব্বপুরুষের নাম শব্দিত করে, স্বর্গ বা পৃথিবীতে যে ত্রাণ করে, বংশপরম্পরা, সন্তান, বান্ধব, জ্ঞাতি, স্বজন, ‘রৌদ্র হইতে ত্রাতা’ (ছত্ত্র), গোরক্ষক, গোষ্ঠ, গোশালা, সঙ্ঘ, সমূহ, বিত্ত, ধন, উপায় … ইত্যাদি। (বঙ্গীয় শব্দকোষ)।

ক্রিয়াভিত্তিক নিয়মে গোত্ত্র শব্দের অর্থগুলি সহজেই বুঝা যায়। যেমন গো মানে সূর্য্যকিরণ, ছত্ত্র সেই সূর্য্যকিরণ থেকে ত্রাণ করে, তাই গোত্ত্র মানে ছত্ত্র। আবার গো মানে পৃথিবী, পর্ব্বত (ভূধর) পৃথিবীকে রক্ষা করে, তাই গোত্ত্র মানে পর্ব্বত। বংশপরম্পরা মানবযূথকে ত্রাণ করে। গোশালা গরুর পালকে রক্ষা করে বলে তাও গোত্ত্র।

৪। গোদ ঃ- গোদাতা, পায়ে রস জমা রোগ বিশেষ, শ্লীপদ (elephantiasis) (ব শ)। ফাইলেরিয়া রোগে পা ফুলে হাতীর (elephant-এর) মত গোদা হয়। একে গোদ বা elephantiasis বলে।

৫। গোদাবরী [গো+দা+বন্‌+ঈ] ঃ- ‘জলদাত্রী’, দাক্ষিণাত্যের পবিত্র নদীবিশেষ। (ব শ)।

৬। চন্দ্রবিন্দু রহস্যময়তার ধারক, তাই গোঁ মানে রহস্যময় গমন।

৭। গোবিন্দ — যিনি (সর্ব্ব-প্রকারের) ‘গো’গণ (গতিশীল সত্তাগণ) বিষয়ে বিদিত (ও তাহাতেই বিদ্ধৃত থাকেন); অথবা, (সর্ব্বোচ্চ অর্থে) চাইলে যিনি তত্ত্বজ্ঞানসমূহের রস দান করেন এবং (সর্ব্বনিম্ন অর্থে) যে রাখাল ভাল দুধ যোগাইতে পারে। শ্রীকৃষ্ণ, বৃহস্পতি; (সাদৃশ্যে) বহু গরুর স্বত্ত্বাধিকারী। -(সরল শব্দার্থকোষ)।

গোঁয়ার-গোবিন্দঃ- গোঁয়ার যে গোবিন্দ; অথবা যে গোবিন্দ (তত্ত্বজ্ঞানী) তাঁহার সিদ্ধান্তে ও সক্রিয়তায় অবিচল থাকেন। কট্টর, মৌলবা্দী। – (সরল শব্দার্থকোষ)।

গোপ — ‘গো’-কে (যাহা যায়, সমাজনিষিদ্ধ সেই বিক্রয়যোগ্যকে) পালন করে যে; কিংবা গুপ্ত করে যে; অথবা যাহারা গোপনে পণ্য উৎপাদন ও বিনিময় করে। পণ্য-উৎপাদক,পণ্যজীবী,(সাদৃশ্যে) গরু পালনকারী। (ব শ)।

গোপন — গোপ অন যাহাতে; অথবা, রাষ্ট্রের চোখের আড়ালে যে পণ্য-বিক্রয়াদি কার্য্য করা হয়; কিংবা, লক্ষণার্থে যাহা কিছু লুক্কায়িতভাবে করা হয়। অপ্রকাশন, লুকানো, ঢাকা। ‘সরল শব্দার্থকোষ’।

৯। ‘গো’পাল শব্দে পণ্যের পালক বুঝতে হবে। কৃষ্ণকে গোপাল বলা হয়। তাঁকে একজন গরুর রাখাল ভাবলে চলবে না (সেটি প্রতীকী অর্থ)।

১০। গিরি শব্দের অর্থ যা নিগিরণ বা উদ্গীরণ করে (উদাহরণ হিসাবে আগ্নেয়গিরি থেকে আগুন নির্গত হয়)। গোবর্দ্ধন গিরি হল সেই সংস্থা (বা পর্ব্বত) যা পণ্য (গো) উৎপাদন বৃদ্ধি করে ও নির্গত করে। কৃষ্ণ গোবর্দ্ধন গিরি ধারণ করেছিলেন।

১১। ‘গো’বর মানে গো-এর বরণীয় অংশ বা পণ্যমূল্য এবং সাদৃশ্যে গোরুর বিষ্ঠা। যজ্ঞে ‘গো’বর খাওয়া কর্ম্মে টাকা ঢালার প্রতীক।

১২। হিন্দুশাস্ত্রে গোবর বরণীয় হলেও গোমাংস ভক্ষণ সম্পূর্ণ নিষেধ। এর অর্থ হল পণ্য বেচে টাকার পাহাড় করা চলবে না। বাহ্যিক গোমাংস ভক্ষণ করলে (beaf খেলে) অবশ্য তত পাপ হয় না (মুসলমানরা তো দিব্যি beaf খান)। ছাগল মাংস ( mutton) বা শুয়ারের মাংস (pork) খেলে যতটা পাপ বা পুণ্য হয়, beaf খেলে প্রায় ততটাই হয়। মানসিক গোমাংসে (ব্যক্তিমালিকানায়) মজে থাকলে মাহাপাপ।

১৩। কৃত্তিবাস রামায়ণের প্রথম লাইনটি হলঃ

“গোলোকে বৈকুণ্ঠপুরী সবার উপর

লক্ষ্মীসহ বৈসে তথা দেব গদাধর।”

এখানে গোলোক মানে গোয়ালঘর নয়, বরং সর্ব্বপ্রকার গো বা ধনসম্পদের মালিক বা জ্ঞানসম্পদের মালিকদের ঘর; যে লোকে বা স্ফীয়ারে শ্রেষ্ট গামিগণের বাস; যে পুরীতে অকুণ্ঠচিত্তে দক্ষকর্ম্মাদি (মায়া) ক’রে যাহারা, অথবা বিকুণ্ঠার (বিবিধমায়ার) অপত্যরা বাস করেন। যেমন বিষ্ণু (নগদ নারায়ণ), যাকে কার্ল মার্কস পুঁজিপতি (capitalist) আখ্যা দিয়েছেন। পৃথিবীর মানুষদের দুঃখ দেখে বিষ্ণুকে বহুবার অবতার রূপে অবতীর্ণ হতে দেখি। হরিচরণবাবু গোলোক শব্দের অর্থ করেছেন্ – ‘গো প্রচুর (তেজোময়) লোক’, ‘শ্রীকৃষ্ণের নিত্যধাম বৈকুণ্ঠের উর্দ্ধস্থিৎ লোক’। বিষ্ণু রাম অবতার হয়ে কী কর্ম্ম করেছিলেন তা এই বইয়ের ‘রম্‌’ কবিতায় বিস্তারিত বলা হয়েছে।