অপরাধ-জগতের ভাষা ও শব্দকোষ

aparadhঅপরাধ-জগতের ভাষা জানতে হলে অপরাধ-জগৎ, তার অধিবাসী এবং তাদের আচারব্যবহার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা চাই। ভাষা মানব সভ্যতার মানচিত্র। বক্তার ভাষা তার পরিবেশ, মানসিক গঠন, শিক্ষাদীক্ষা সম্পর্কে অবহিত করে৷ ভাষাবিজ্ঞানের অনুবীক্ষণে ভাষাগোষ্ঠীর সামাজিক সাংস্কৃতিক রূপ ধরা যায় অথবা এই রূপটির সঙ্গে পরিচিতির জন্য ভাষা অন্যতম অবলম্বন বলে বিবেচিত হতে পারে। সমাজজীবনের একটি অঙ্গ তমসাচ্ছন্ন থাকলে অর্থাৎ অপরাধ এবং অপরাধ-প্রবণতায় ঢাকা পড়লে সেদিকে না তাকালে দায়িত্ব আমাদের ফুরিয়ে যায় না৷ বাস্তব সত্যকে সাহসের সঙ্গে স্বীকার করতে হবে। জানতে হবে-মানুষ কেন অপরাধ করে? তার অপরাধের জন্য দায়ী কে? যে সমাজব্যবস্থা মানুষের অপরাধ-প্রবণতাকে সুড়সুড়ি দিয়ে জাগিয়ে তোলে সেই সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটলে অপরাধ-প্রবণতার কী লয় হবে? এমনি কত শত প্রশ্ন রয়েছে। প্রগতিশীল সমাজবিজ্ঞানীরা এ সকল প্রশ্নের উত্তর দেবেন নিশ্চয়ই। আশা করবো সুস্থ মানবসমাজ একদিন জন্ম নেবে। ‘অপরাধ-জগৎ’ নামের কোনো ক্যানসার গ্র্যাণ্ড আগামী দিনের সমাজ সযত্নে লালন করবে না৷ অপরাধ-জগৎ এবং অপসংস্কৃতি আগামী দিন অতীতের ইতিহাস হতে বাধ্য হবে। সমাজ বিবর্তনের ইতিহাস মেনে নিলে তাইতো হওয়া উচিত। তবে একথা সত্য যে পরিবর্তন রাতারাতি আসবে না। একটি জীবন্ত সমাজে দীর্ঘকাল ধরে চলবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যেমন চলছে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রগতিশীল দেশ অধুনালুপ্ত সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে। সে-দেশে এখনো অপরাধ রয়েছে, এখনো তা মুছে যায়নি। মাত্র (সত্তর)* বছরে হাজার হাজার বছরের সঞ্চিত পাপ লোপ পাবার নয়। সেখানেও ভুলত্রুটি হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সংশোধনের ব্যবস্থাও হচ্ছে এবং হবে। অপরাধ-জগতের ভাষার মাধ্যমে অপরাধী, অপরাধ-জগৎ এবং তার বাইরে যে বৃহত্তর সমাজ রয়েছে, যে-সমাজ এই অকল্যাণকর জগতের স্রষ্টা তাকেও জানার সুবিধা হবে। পাতালপুরীর রহস্য ভেদের একটি উপায় সন্ধা ভাষার সঙ্গে পরিচিতি। সুতরাং সন্ধ্যা ভাষাচর্চা দুটি জগৎকে চিনিয়ে দেবে: (ক) অপরাধ-জগৎ এবং (খ) তথাকথিত সাধু সমাজ অর্থাৎ যে সমাজব্যবস্থা এই বিকলাঙ্গ মানসিকতার জন্মদাতা। একদা বন্য মানুষ ভাব প্রকাশের জন্য পেলো ভাষা, শিখলো দুটি হাতের ব্যবহার৷ শিখলো অগ্নিকে করতলগত করতে; বৈদিক ঋষি অগ্নিকে বিশেষিত করেছেন, ‘রত্ন-ধাতম’ (ঋগ্বেদ ১.১.১) বলে। বস্তুজগতের নিয়ন্ত্রণকর্তা অগ্নি। দুটি হাত, ভাষা এবং আগুন-তিনের সমন্বয় মানুষকে পশু জীবন থেকে মুক্তির আহ্বান জানালো। ভাষা একটি হাতিয়ার, যার সাহায্যে মনের গোপন কথা মুখর হলো। আর পৃথিবী উদ্বেলিত হলো সভ্যতার আলোকচ্ছটায়৷ আদিম মানুষ পশুপালন ও চাষবাস পদ্ধতি আবিষ্কার করলো। কালক্রমে উৎপাদনের উপায়গুলি (means of production) গোষ্ঠীপতিরা দখল করে নিলো। গোষ্ঠীসম্পত্তি বেমালুম ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে গেলো। স্ত্রীজাতি তার স্বাধীনতা হারালো, হলো পুরুষের ভোগের উপচার। পুরুষ-শাসিত সমাজব্যবস্থা চালু হলো। দিনের পর দিন যায়। জন্ম নিলো দাসপ্রথা, গণিকাবৃত্তি, যুদ্ধ, অপহরণ। সমাজ ভাগ হলো দুটি শ্রেণীতে-শোষক আর শোষিত। কালে মাথা চাড়া দিলো সামন্ততান্ত্রিক-ধনতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কাত। অবশ্য সব কিছুরই বিকাশ ঘটেছে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সূত্রে বিবর্তনের পথে, বহু সহস্র বর্ষ সময় লেগেছে পথ পরিক্রমা করতে। এখন প্রশ্ন, কেন এই অপসংস্কৃতি? কেন এর বিস্তার এবং মূল সূত্রটি কোথায় লুকানো রয়েছে? সামন্ততান্ত্রিক যুগেও যৌন ও হিংসাবৃত্তি বেশ খানিকটা অনাবৃতই ছিল। বুর্জোয়া সমাজের শুরুতেও যৌন ও হিংসাবৃত্তি ছিল। তখন অপরাধবোধ ও অপরাধপ্রবণতা তেমন প্রকট হয়ে ওঠেনি। অধোগতির সময়ে অপরাধপ্রবণতা ভেতরে ভেতরে অনুপ্রবেশ করলো। অপসংস্কৃতি বলতে বর্তমানে সাধারণত বিকৃত যৌন ও হিংসাত্মক ক্রিয়াকলাপকেই বোঝানো হয়। লেনিনের ‘glass of water’ তত্ত্ব অপসংস্কৃতির চরম পর্যায়। আবার রাতের নুইয়র্ক শহর হঠাৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়ায় সেখানে মুহুর্তে পাতালপুরী জন্ম নিল। বড়ো বড়ো নামী দোকান ভেঙে দামী সামগ্রী সব লুঠ হয়ে গেল। মুহুর্তে শতসহস্ৰ পাপ মাথাচাড়া দিল। শুধুমাত্র যৌন ও হিংস্র প্রবৃত্তিকেই কি আমরা অপসংস্কৃতি বলবো? অপসংস্কৃতি ভারতীয় সমাজজীবনের এক সামাজিক ব্যাধি। বটবৃক্ষের শেকড়ের মতো কয়েক হাজার বছর ধরে আমাদের সমাজদেহের কাঠামোকে যা জর্জরিত করে রেখেছে তাকে অপসংস্কৃতি (anticulture) বলে বিবেচনা করা কি অন্যায় হবে? জাতি-উপজাতি, বিভিন্ন ধর্ম ও ভাষাগোষ্ঠী এবং জাতপাত নীতি নিয়ে বিভেদপন্থী প্রগতিবিরোধী শক্তির ক্রিয়াকলাপও অপসংস্কৃতি। যে সংস্কৃতি সমাজ ও জনগণের প্রগতির প্রতিকূল তা অপসংস্কৃতি। সুস্থ যৌন জীবন যেমন অপসংস্কৃতি নয় তেমনি হিংসা মাত্রেই অপসংস্কৃতি নয়—যেমন মুক্তির জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের সংজ্ঞা হবে ভিন্ন৷ আবার অসংখ্য চারিত্রিক ক্রটি-বিচূতি ও রুচির হেরফের, যেমন ‘ঝি চাকর’ ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের যে মনোভাব যা দাসপ্রথা ও সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতির জের টেনে চলেছে তা কি অপসংস্কৃতি নয়? লাগামহীন অপসংস্কৃতি ও তার বিস্তারকে কড়া শাসনে কেবল চাপা দেওয়া যায়; মুছে ফেলতে চাই অন্য ব্যবস্থা। ‘মূনাফা, আরো মূনাফা যে সমাজের মূলমন্ত্র তার হাতে বিকৃত যৌন ও হিংসাত্মক মানসিকতার প্রচার সব থেকে বড়ো অস্ত্র৷ মুনাফার সঙ্গে অপরাধপ্রবণতার নাড়ীর যোগ৷ সম্পর্ক মাতাপুত্রীর। অপসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রথম দুটি রিপুর ভূমিকা সর্বগ্রাসী। মুষ্টিমেয় মানুষ যতবেশি মুনাফা চাইবে সমাজের সাধারণ মানুষের একাংশকে ততটা অপরাধপ্রবণ করে তোলার প্রস্তুতি থাকবে৷ বড়োমাছ ছোটমাছ খাবে। কোন সমাজব্যবস্থায় ‘মহাজনী সভ্যতা’ শাস্তিযোগ্য অপরাধ, আবার কোথাও বা এই সভ্যতার প্রবক্তারা মহামান্য কুলপতি! আন্তর্জাতিক শিশুবর্ষের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে: কুড়ি কোটি শিশু আমাদের এই পৃথিবীতে শিশু-শ্রমিকের কাজ করে৷ ভারতবর্ষে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ১ কোটি ৬৫ লক্ষ, children have been maimed in India to become beggars… —The Statesman, December 3, 1979 India has the largest child labour force in the world, with 16.5 million children working for long hours in dangerous conditions for little pay, the AntiSlavery Society reported. —The Statesman, December 5, 1979 সমাজে শিশুঘাতী মোহন্তদের সম্পর্কে কবি সুকান্তর প্রার্থনা: এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি— । কিন্তু পৃথিবী আজও শিশুর বাসোপযোগী হয়ে ওঠেনি। রাষ্ট্রসঙ্ঘের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক (ইউনিসেফ) বিশ্বে শিশুদের অবস্থা–১৯৯২ যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে শিশু-সংহারের যে চিত্র উদঘাটিত হয়েছে তার কিছু কিছু অংশ প্রয়োজনবোধে আমরা এখানে উল্লেখ করছি। এতে বলা হয়েছে, এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে ১৪ বছর বয়সের নীচের মোট শিশুদের ২০ শতাংশের বেশি শিশু-শ্রমিক। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে সাড়ে সাত কোটিরও বেশি শিশু-শ্রমিক। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে এই প্রতিবেদন লিখেছে ২৫ কোটি মানুষের এই দেশে হাজার হাজার শিশু আছে—খেলাধূলা করা, বিদ্যালয়ে যাওয়া, আমোদ-আহ্লাদ করার সুযোগ জীবনে যাদের আসেনি—খাটুনি খেটে পেটের ভাত সংগ্রহ করতে হয়। বিশ্বব্যাঙ্কের হিসেব অনুযায়ী বিশ্বের পরিবারিক মোট আয়ের ২২ শতাংশ উপার্জন করে শিশুরা। ভারতে ৬-১৪ বছর বয়সের শিশুর সংখ্যা ২১ কোটি। এর মধ্যে ৪ কোটি ২০ লক্ষ শিশু-শ্রমিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের মোট শ্রমজীবী মানুষের ২৬ শতাংশ শিশু। তাছাড়া ভারতে ১০ লক্ষ দাস-শ্রমিক (Slavc-Labour) রয়েছে। দেশের অতি জঘন্য অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দরিদ্র পিতামাতারা টিকে থাকার তাগিদে প্রাণের অধিক প্রিয় শিশুদের নারকীয় পরিবেশে কাজ করতে দিতে বাধ্য হন। বিনিময়ে এইসব হতভাগ্য শিশুরা কঠোর পরিশ্রমের মূল্য হিসেবে কিঞ্চিৎ অর্থ পেয়ে থাকে আর যৌবন সাধারণত তারা দেখতে পায় না। তার পূর্বেই এদের পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়। তামিলনাডু, শিবকাশী এলাকায় দেয়াশলাই ও বাজির কারখানায় কাজ করে লক্ষাধিক শিশু-শ্রমিক! এ শুধু একটি উদাহরণ মাত্র। এমনি করেই ধনী মহাজনরা আমাদের দেশে শিশু জীবনকে লোভ দেখিয়ে পঙ্গু করে দিচ্ছে। ( আন্তর্জাতিক রিপোর্টটি শ্রী কান্তি বিশ্বাসের নিবন্ধ থেকে গৃহীত। ‘গণশক্তি’, ২৫ জুলাই, ১৯৯২)। এইসব হতভাগ্য শিশুদের একাংশকে পাতালপুরী গ্রাস করতে বাধ্য এবং করছেও। এমনি করেই অপরাধ-জগতের শ্রীবৃদ্ধি! আমরা জানি লোধ বা অন্য যাযাবর জাতিকে চাষবাসে না বসিয়ে অপরাধী-উপজাতি (criminal tribes) রূপে গণ্য করা হলো। এটা সাম্রাজ্যবাদী চিন্তা। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু ঔপনিবেশিক চিন্তা ও তার কুফল আজও সমাজে জড়িয়ে রয়েছে। আজও বিচ্ছিন্নতাবাদ, জাতি-উপজাতি লড়াই, ধমীয় সংঘর্ষ, এক বর্ণের ওপর অন্য বর্ণের হামলা রয়েছে—এসবই তো অপসংস্কৃতি। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দ। বিংশ শতাব্দীর প্রান্তিক কাল। চুনি কোটাল ভারতের প্রথম মহিলা লোধা গ্র্যাজুয়েট। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে আত্মঘাতী হলো। পৌরাণিক যুগে রামরাজ্যে রাম স্বহস্তে শম্বকের মাথাটি কেটে ফেলেন। কারণ সাধনার দ্বারা শ্রেষ্ঠ বর্ণের অধিকার শূদ্র শম্বুক অর্জন করতে চাইল। তাইতো হত্যা! পৌরাণিক যুগ থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত সামাজিক অগ্রগতির পদক্ষেপ কতটুকু হয়েছে তার সাক্ষ্য দিচ্ছে শম্বক চুনি কোটালরা৷ মানব সভ্যতার আদিতে অপরাধ-জগতের অস্তিত্ব ছিলো না। অপরাধ-প্রবণতা সমাজ জীবনের উপর-কাঠামোর (Super-structure) সঙ্গে জড়িত। একটি ভাষাগোষ্ঠীর (speech community) মুখের ভাষা উপর-কাঠামো নয় সত্যি, তবে যখন কোনো ভাষা, বিশেষত শব্দভাণ্ডার কোনো বিশেষ সংস্কৃতির নির্দেশক হয়, তখন সেই সংস্কৃতির প্রসার, পরিবর্তন বা অবলুপ্তির ওপর বিশেষ ভাষাটির অস্তিত্ব অথবা অবলুপ্তি নির্ভরশীল। যেমন lingo,cant, jargon, argot, anti-language প্রভৃতি সমাজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে, উপর-কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে এদেরও পরিবর্তন হবে, ক্ষয় হবে, লয় হবে। কোনো সমাজের সাংস্কৃতিক জীবন তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর-কাঠামো। অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অবশ্যম্ভাবী ফল সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটে খুবই ধীর পদক্ষেপে। প্রতিটি সমাজব্যবস্থার ইতিবাচক সংস্কৃতি পরবর্তীকালের সমাজে জায়গা করে নেয়। দাসপ্রথার অবদান গ্রীক সভ্যতার ৮০/৯০ শতাংশ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। স্বয়ং মার্কসও নানাভাবে তা স্বীকার করেছেন। বুর্জোয়া সমাজের গোড়ার দিকে বলিষ্ঠতা ছিল, সেক্সপীয়রের মতো প্রতিভাও ছিল। সেক্সপীয়রের ফলিতরূপ নাটকের ভিতর দিয়ে যতটুকু পৌঁছালো পরবতী যুগে তা শুধু পাঠ্যপুস্তকের মধ্যেই থেকে গেল। জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হলো। শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে যোগ রইল না। ভারতবর্ষে সামন্ততন্ত্রের যুগে শিল্প সাহিত্য মার্গসংগীত নবকলেবরে জন্ম নিল যা আজও আদৃত হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের মতো প্রতিভা তো পরাধীন ভারত পেয়েছে! স্বাধীনতার পর রবীন্দ্রনাথের সমাদর কী এতটুকু কমেছে? মনে হয়, শিক্ষার বিস্তারের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মর্যাদা ক্রমশ আমাদের দেশে বৃদ্ধি পাবে। Sophocles, Aeschylus-এর সৃষ্টি মূলগ্রীক ভাষায় পাঠ করে মার্কস আনন্দ পেতেন। দাসপ্রথার গোড়ায় গলদ সত্ত্বেও তার যে ইতিবাচক সত্তা রয়েছে বিশ্বসংস্কৃতির ক্ষেত্রে তার মূল্য অনস্বীকার্য। দাসপ্রথা সামন্ততন্ত্র ধনতন্ত্র উপনিবেশবাদ নয়া-উপনিবেশবাদ প্রতিটি ব্যবস্থায় কিছু না কিছু ইতিবাচক সত্তা রয়েছে। যদি কেউ একটি ব্যবস্থার কিঞ্চিৎ ইতিবাচক সত্তার পক্ষ নিয়ে প্রমাণ করতে চান যে ব্যবস্থাটি কল্যাণকর তবে তিনি মঞ্চে এ প্রমাণও করবেন যে তার চিন্তাধারা প্রগতিবিরোধী, বিপরীতমুখী। সামন্ততান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বেদি-ভূমিতে অপরাধ-প্রবণতার জন্ম। সামন্ততান্ত্রিক এবং ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটলে অপরাধ-জগৎও ক্রমশ লোপ পাবে৷ যদি কোনোদিন অপরাধ-জগতের বিলুপ্তি ঘটে সেদিন অপরাধ পদ্ধতির গোষ্ঠীভাষাও (Social dialect) লোপ পাবে। যে-অংশ থেকে যাবে তা প্রতিদিনের সাধারণ ভাষার সঙ্গে মিশে যাবে। সাধারণ ভাষা যা গ্রহণ করছে, করছে ঐতিহাসিক পরিবেশের সহায়তায়। তখন এ জাতীয় ভাষা আর উপর-কাঠামোর অঙ্গ বলে গণ্য হচ্ছে না৷ উপর-কাঠামোর স্থিতিশীলতা সর্বকালীন নয়। পাতালপুরীর সংস্কৃতির একটি বাহন তার শব্দভাণ্ডার; সংস্কৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটবে এবং পুরনো অপ্রচলিত শব্দগুলি বাতিল হবে। এ-ভাষার বিস্তৃত আলোচনা সামাজিক অর্থবিন্যাস বুঝতে সাহায্য করে। বিভিন্ন কালের পাতালপুরীর সন্ধা ভাষা অনুশীলনের দ্বারা অপরাধজগতের ক্রমবিবর্তন সম্পর্কে ধারণা করা যেতে পারে। আমরা দেখি, প্রয়োজনাতিরিক্ত সঞ্চয় (পরের শ্রম অপহরণ ?) প্রবৃত্তি অপরাধ-প্রবণতা ও অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটালো সমাজজীবনে৷ সমাজ নানা দল উপদলে ভাগ হলো। অনেকে নাম লেখালো অপসংস্কৃতির খাতায়, হুহু করে অপসংস্কৃতির বিস্তার হলো। একটি বিশেষ বৃদ্ধিমান শ্রেণী অপসংস্কৃতির ব্যবসায়ে ফুলে ফেপে উঠলো। পৃথিবীর বৃহদংশ জুড়ে অপসংস্কৃতির ফলাও ব্যবসা নয়া-উপনিবেশবাদ-সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞরা জানেন, কিভাবে যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে শিল্প সাহিত্য সংগীত প্রভৃতি থেকে শুরু করে জীবনের সর্বত্র রন্ধে রন্ধে অবাধ গতিতে সূক্ষ্মতর পথে তার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। মানবমনকে তার হিংস্র পাশবিক কামড় জর্জরিত করে রেখেছে। চেতনশীল মানবজাতির একাংশ অপরাধবৃত্তির নারকীয় মুখোস খুলে দিতে যুগ যুগ ধরে চেষ্টা করছে। আশা করবো, আগামী দিনের মানুষ পাপাচার ও অপসংস্কৃতিমুক্ত অমলিন জীবনের স্বাদ পাবে। অনেকে জানতে চান, কেন এ জাতীয় বিচিত্র গবেষণায় হাত দিলাম—? গরমের ছুটি। যাবো কলেজ স্ট্রট। উঠবো ট্রামে, দেখি, ট্রামের ভেতর থেকে হিড়হিড় করে বার করে আনা হচ্ছে একটি ছেলেকে। রাস্তায় লোকের ভিড়। ছেলেটার ওপর জোর জুলুম মারধর শুরু হলো। যে-মানুষকে দেখলে মনে হয় অতি ভীরু কাপুরুষ, জীবনে মুখ ফুটে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করেনি কোনোদিন, তেমনতরো এক বীরপুরুষ সদপে এগিয়ে গেলো, উচিয়ে হাত তুললো, তারপর ছেলেটাকে পিটিয়ে দিলো দুদ্দাড়িয়ে। ছেলেটা পকেটমার। সূচলো জুতো ড্রেন-পাইপ ট্রাউজার-পরা সুদর্শন যুবক। ধরা পড়েছে মনিব্যাগ টানতে গিয়ে। বেচারা। লাইনের ছুটকোদ (নতুন চোর), ওস্তাদের হাতে ট্রেনিং জুতসই হয়নি তখনো। কলেজে পৌঁছে একতলার ক্ষুদ্রতম ঘরখানা খোলালাম। নিরিবিলি ঘরে বসে আছি চুপচাপ—দূরে একটা কাক অনবরত ডেকে চলেছে, সে ডাকে যেন কোনো অজানা বেদনার ভাপ ছড়াচ্ছে দিকে দিকে। ফটকের পাশের কাঠাল গাছটিকে ঘর থেকে দেখা যায়। সেদিন বৈশাখ মাস, গাছটি পাতায় পাতায় ছিল ভরে। একটা দমকা বাতাস দুপুরের গুমোট গরমের গালে সজোরে চড় বসিয়ে দিল, পাতাগুলো কেঁপে কেঁপে উঠলো; গাছের পাতা একদিন ঝরে যাবে, ঝরে যাবে তার অপরূপ শোভা। নগ্ন ডালপালা আকড়ে সে দাঁড়িয়ে থাকবে, কিন্তু কিসের প্রত্যাশায়? সে জানে, আবার বসন্ত আসবে। সেদিন নতুন করে ভরিয়ে তুলবে নিজেকে লতায় পাতায়। … ওই যে পকেটমার ছেলে, যার জীবনে পাতা-ঝরার খেলা চলেছে সে কি কোনোদিন সুস্থ জীবনের স্বাদ পাবে না। তার যে দিনগুলো গেল সে কি একেবারেই গেল! ভাবলাম, কে এদের জীবনের জয়গান শোনাবে? এদের বাঁচাবে কে, কি করে এরা জীবনে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে। বাঁচাবার ক্ষমতা নেই তবে এদের জানবার বোঝবার জন্যে মন কৌতুহলী হলো – ভাবছি কেমন করে প্রবেশ করা যায় ওদের রাজ্যে? ভাষাবিজ্ঞানী যখন, স্থির করলাম অপরাধজগতের ভাষা নিয়ে গবেষণা করবো। অপরাধ-জগতের ভাষার গবেষণায় অপরাধী প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবে না, তবে তাদের মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় এ ভাষা হয়তো পরোক্ষভাবে সাহায্য করতে পারে। যে-পকেটমার ছেলেটাকে কেন্দ্র করে গবেষণা শুরু করি, ঘটনার বছর দুই পরে জেনেছিলাম, সে একজন উচ্চশিক্ষিত লোকের ছেলে, সঙ্গদোষে পকেটমারের পেশা বেছে নিয়েছে। বাড়ি থেকে পালিয়েছে। বাবার মুখোমুখি হতে সাহস পায় না। কালে-ভদ্রে লুকিয়ে-চুরিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যায়। প্রশ্ন করেছিলাম,– মার সঙ্গে তোমার কী কথা হয়? মা শুধু কাদতে থাকে। কথা কটা বলে মুখ নত করেছিলো। জেরার মুখে এমনি কত কথাই বললো। বেডটি (মদ) না খেলে সকালে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না! সমাজ-জীবনের ‘অসংস্কৃত’ অংশে পাই অপরাধ-জগৎকে। তথাকথিত অতি-সংস্কৃত সমাজের মধ্যেও অপরাধ-জগতের সন্ধান পাওয়া যায় অহরহ। তবে এই গ্রন্থের আলোচ্য বিষয় সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে অন্য আলোচনা থেকে বিরত থাকতে চাই। অতীতের ভারতবর্ষে অ-সংস্কৃত জগৎ সম্পর্কে যে ঔদাসীন্য দেখানো হয়েছিল সে ধারা আজও অটুট রয়েছে। সমাজ হলো সভ্যভব্য সাক্ষর নিরক্ষর ধনী দরিদ্র সর্বহারা অগণিত মানুষকে নিয়ে। অপরাধী এবং অপরাধ-প্রবণ মানুষ থাকলে (বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় যা থাকতে বাধ্য) তাদেরও সমাজের অঙ্গবিশেষ বলে স্বীকার করতে হবে। দুর্বল অঙ্গটির প্রতি ইচ্ছে করে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারি, তবে ইতিহাসের পটভূমিকায় তাকে অস্বীকার করি কেমন করে? আমাদের দেশে পাতালপুরীর ভাষা পাতালেই থেকে গেছে। ওপর-তলার মানুষ কখনো কোনোদিন তা জানবার আগ্রহ দেখালো না। গত দুশো বছরের ব্যবহৃত স্নাং শব্দগুলি ধরে রাখতে পারলে দেখা যেতো কত শব্দ অপরাধ-জগতের প্রাচীর টপকে আমাদের প্রতিদিনের ব্যবহৃত আধুনিক চলিত ভাষার সঙ্গে এক পঙক্তিতে বসে গেছে। এ জাতীয় সংকলনের বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। ইংলণ্ডে, যুরোপের বিভিন্ন দেশে, আমেরিকায় এবং জাপানে লঘু শব্দ সংকলিত হয়েছে। এসব শব্দভাণ্ডার থেকে বহু শব্দ সাহিত্যিক-সাংবাদিকের হাতে পড়ে লৌকিক শব্দভাণ্ডারের পুঁজি বৃদ্ধি করেছে। Eric Partridge ইংরেজি স্ল্যাং ও হালকা শব্দ (A Dictionary of the Underworld; A Dictionary of Slang and Unconventional English) সংকলন করে পৃথিবী-বিখ্যাত। বিলাতের বিখ্যাত New Statesman পত্রিকায় Eric Partridge-এর অভিধান সম্পর্কে মতামতের অংশবিশেষের উদ্ধৃতি হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না –‘It is a really epoch-making, monumental piece of work, carried out with astonishing industry and learning.’ অপরাধ-জগতের ভাষাকে আমরা বলতে পারি একটি গোষ্ঠীভাষা (social dialect)। জেলে, জোলা, মুচি, মেথর, কামার, কুমোর প্রভৃতির ভাষাও গোষ্ঠীভাষার অন্তর্গত। এ জাতীয় ভাষার অপর নাম বর্ণভিত্তিক ভাষা (caste dialect)। শান্তিনিকেতনের বাচনভঙ্গিও গোষ্ঠীভাষার দৃষ্টান্ত, এখানের বৈশিষ্ট্য বোলপুরের আঞ্চলিক ভাষার অন্তর্গত নয়। গোষ্ঠীভাষায় বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার প্রভাব পড়তে পারে, সোশ্যাল ডায়লেক্ট লোকাল ডায়লেকটের ধর্ম সর্বত্র হুবহু মেনে চলে না। নারীর ভাষাও গোষ্ঠীভাষার অন্তর্গত। পশ্চিমবাঙলার সমাজবিরোধীরা আসে নানা জায়গা থেকে, কথা বলে ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায়। কোলকাতার অপরাধীদের ভাষা খাস কোলকাতার সর্বজনগ্রাহ্য ভাষা নয়। অপরাধী ও সমাজবিরোধীদের একটি অংশ মাত্র কোলকাতার বাসিন্দা। তাদের অনেকের ভাষা কোলকাতা-ককনি জাতীয়। বাগবাজার, আহিরীটোলা, কুমারটুলি, বউবাজার, জেলেটোলা প্রভৃতি অঞ্চলের প্রাচীন রক্ষণশীল পরিবারের অর্ধশিক্ষিত বা নিরক্ষরদের অনেকের মুখের ভাষায় (উত্তর) কোলকাতার প্রাচীন ককনির রেশ কানে ধরা পড়ে। পশ্চিমবাঙলার অপরাধ-জগতের অন্যেরা আসে বাঙলার জেলাগুলো থেকে, আসে বাঙলাদেশ, বিহার এবং উত্তর প্রদেশ থেকে। শেষোক্ত দুই রাজ্য থেকে আসা অপরাধীর সংখ্যা অগুনতি। ভারতবর্ষে এমন কোনো রাজ্য নেই যেখানকার বনেদী অপরাধীরা একবার কোলকাতা ঘুরে না গেছে। কোলকাতা বোম্বাই অপরাধ-জগতের স্বর্গভূমি। পশ্চিমবাঙলার অপরাধ-জগতের ভাষা বাঙলা, হিন্দি, ভোজপুরী, মগহী, উর্দু সবমিলিয়ে এক জগাখিচুড়ি। এই জগাখিচুড়ি ভাষা অপরাধীদের বড়ো প্রিয়—তাদের জীবনবেদ। এ ভাষা বুদ্ধিবিহারীর ধ্ৰুপদী ভাষা নয়। মানুষকে জানতে ভাষা সর্বশ্রেষ্ঠ অবলম্বন। সে ভাষা সাধারণ, মিশ্র অথবা কৃত্রিম যাই হোক তাতে কিছু আসে যায় না। অপরাধ-জগতের মানুষকে জানতে হলে যেমন তাদের ভাষা জানা চাই, তেমনি তাদের নিষেধ লোকাচার এবং কুসংস্কারও জানার প্রয়োজন রয়েছে। এগুলি জানতে পারলে সমাজবিরোধীদের মনস্তত্ত্বের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ সম্ভব। যদি তাদের ভাষা আমরা বুঝতে না পারি তবে কেমন করে তাদের সুস্থ জীবনের পথে পৌছে দেবার কথা ভাবতে পারি? বিপরীত ভাষায় (antil anguage) সাধারণ ভাষার সূত্রগুলি প্রায় হুবহু কার্যকরী হতে দেখা যায়। অপরাধ-জগতের ভাষার দুই দিক থেকে বিস্তার ঘটেছে: একটি হলো পেশাদার অপরাধীদের ভাষা৷ তারা নানা জাতের অপরাধমূলক কাজ করে থাকে-চুরি, পকেটমারি, রাহাজানি, মদ চোলাই, মেয়ে বেচাকেনা, চোরাইমাল কেনাবেচা ইত্যাদি। অপরটি হলো বয়েযাওয়া যুবক, উঠতি গুণ্ডা ও মস্তানদের ভাষা। এই দলে শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও নিরক্ষর সকল রকমের যুবকেরই সন্ধান মেলে। পেশাদার অপরাধীরা তাদের ব্যবহারের ভাষাকে (উলটি বাতোলা, ঘুনু ইত্যাদিও বলে থাকে) পুলিশ ও জনসাধারণের কাছে গোপন করে রাখে। দুটি ভিন্ন ধরনের অপরাধী গোষ্ঠীর অপরাধের পদ্ধতি যেমন এক ধরনের নয় তেমনি তাদের সৃষ্ট ও ব্যবহৃত শব্দাবলীর মধ্যেও দুস্তর প্রভেদ রয়েছে। পকেটমারের ভাষা জুয়াচোর বা প্রতারকের ভাষা থেকে হবে ভিন্ন ধাঁচের। ভিন্ন ভিন্ন দল বা গোষ্ঠীর শব্দ সংকলন নিয়ে আলোচনা করলে বিভিন্ন দলের কর্মপদ্ধতি এমনকি অপরাধপ্রবণ মনের বিশ্লেষণ করা যেতে পারে৷ অপরাধ-জগতের ভাষা জানতে অপরাধ পদ্ধতিও জানা চাই।

সূত্র: ভূমিকা, অপরাধ-জগতের ভাষা ও শব্দকোষ, ভক্তি প্রসাদ মল্লিক